ভাসানচর: হাতিয়া না সন্দ্বীপ? ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে নোয়াখালীবাসীর ক্ষোভ

মামুন রাফী , নোয়াখালী জেলা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম

ভাসানচরের ছয়টি মৌজা নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নয়, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্গত হবে বলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে নোয়াখালীবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের গঠিত কারিগরি কমিটি ভাসানচরকে সন্দ্বীপের অন্তর্গত বলে প্রতিবেদন দিলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ শাখা ১৩ জানুয়ারি সেই মোতাবেক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পাঠায়।

এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই নোয়াখালীর সর্বস্তরের মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন। তাদের দাবি, ভাসানচরকে হাতিয়া উপজেলার অনুকূলে দিয়ারা জরিপ সম্পাদন করে চূড়ান্ত রেকর্ড প্রকাশ করা হয়েছে এবং হাতিয়া উপজেলাধীন চর ঈশ্বর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করে ভাসানচর থানা গঠনও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তাদের অভিযোগ, একটি কুচক্রী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অঞ্চলের শান্তি ও শৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে ভাসানচরকে বিতর্কিত ইস্যু বানানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬০-এর দশক থেকে হাতিয়া উপজেলায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। গত প্রায় ৬৮ বছরে নদীভাঙনে হাতিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা মেঘনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেই প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা ভাসানচরকে হাতিয়ার স্বাভাবিক ভৌগোলিক সম্প্রসারণ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। ২০১০ সালে ভাসানচর দৃশ্যমান হলেও ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের সিদ্ধান্তের পর দ্বীপটি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে। সে বছরই সরকারি জরিপের মাধ্যমে ভাসানচরকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পরে ২০০২–২০০৩ সালে হাতিয়া উপজেলাধীন বন বিভাগ সেখানে বনায়নের কাজ শুরু করে। বর্তমানে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পসহ রাষ্ট্রীয় সব ধরনের প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কার্যক্রম হাতিয়া উপজেলার অধীনেই পরিচালিত হচ্ছে।

সরকারের গেজেট ও বিদ্যমান প্রশাসনিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে ভাসানচরকে সন্দ্বীপের সঙ্গে যুক্ত করার অপচেষ্টার প্রতিবাদে হাতিয়াসহ জেলা ও রাজধানীতে ‘ভাসানচর রক্ষা আন্দোলন’ অব্যাহত রয়েছে। হাতিয়ার বাসিন্দা আজম বলেন, “ভাসানচর হাতিয়ার মানুষের রক্ত-ঘামে গড়া ভূমি। যুগের পর যুগ নদীভাঙনে আমরা সব হারিয়েছি। এখন নতুন করে জেগে ওঠা ভূমিটুকুও যদি কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?” স্থানীয় শিক্ষক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, “এটি শুধু ভূমির প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। প্রশাসনিকভাবে, ঐতিহাসিকভাবে এবং বাস্তবতায় ভাসানচর হাতিয়ার অংশ। এ নিয়ে কোনো আপস হবে না।” রওশন আরা বেগম নামের আরেক শিক্ষক বলেন, “আমরা মা-বোনেরা ঘরে বসে থাকব না। প্রয়োজনে রাজপথে নামব। ভাসানচর আমাদের, আমরা জীবন দেব কিন্তু ভূমি দেব না।”

এদিকে ভাসানচর নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের প্রার্থী আব্দুল হান্নান মাসউদ। তিনি বলেন, “ভাসানচর হাতিয়ার ছিল, হাতিয়ারই থাকবে। দরকার শুধু ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ। আমরা লড়াই করেছি, সামনেও করবো ইনশাআল্লাহ। শেষ পর্যন্ত হাতিয়াবাসীরই বিজয় হবে।” একই বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও নোয়াখালী-৬ আসনের প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, “ভাসানচর হাতিয়ার অংশ এবং এটি হাতিয়ার চর ঈশ্বর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। হাতিয়ার জনগণের এক ইঞ্চি ভূমিও যেন কেউ দখল করতে না পারে—এটাই আমাদের স্পষ্ট অবস্থান। সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় বিএনপি অতীতের মতো ভবিষ্যতেও রাজপথ ও আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে।”

Link copied!