দেশে প্রথমবারের মতো উচ্চ খরা সহনশীল ইনব্রিড সয়াবিন জাত ‘জিএইউ সয়াবিন-৬’ উদ্ভাবন করেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি)।
দীর্ঘ এক দশকের গবেষণার ফল হিসেবে কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রখ্যাত কৃষিতত্ত্ববিদ ড. এম. এ. মান্নান-এর নেতৃত্বে উদ্ভাবিত এ জাতটি ইতোমধ্যে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন পেয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, তাইওয়ানের এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগৃহীত প্রায় ২৫০টি জার্মপ্লাজমের মধ্যে কঠোর তিন বছরের গবেষণায় ‘জি০০০৫৬’ জার্মপ্লাজমটি খরা-সহনশীল হিসেবে চিহ্নিত হয়।
পরবর্তীতে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ভোলায় পাঁচ বছর মাঠপর্যায়ে সফল মূল্যায়নের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর জাতীয় বীজ বোর্ড এ জাতের আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র দেয়।
গবেষকরা জানান, ৫০-৬০ শতাংশ ফিল্ড ক্যাপাসিটির মতো কঠিন খরা পরিস্থিতিতেও এ জাত টিকে থেকে উচ্চ ফলন দিতে সক্ষম। প্রতি গাছে ৮০-১০০টি ফল ধরে এবং বড় দানার কারণে ১০০০ বীজের ওজন প্রায় ২৩০ গ্রাম। হেক্টরপ্রতি ৩.২ থেকে ৩.৮ টন ফলন পাওয়া সম্ভব, যা সাধারণ জাতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মাত্র তিন মাস থেকে তিন মাস ১০ দিনের মধ্যেই ফসল পরিপক্ব হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় চরাঞ্চলের অনাবৃষ্টি, লবণাক্ততা ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে এতদিন সয়াবিন চাষ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। ‘জিএইউ সয়াবিন-৬’ সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।
ড. মান্নান বলেন, “জিএইউ সয়াবিন-৬ আমাদের দীর্ঘ নিরলস গবেষণা ও কৃষকের স্বপ্নের সম্মিলিত ফসল। খরা-প্রবণ জমিতে সয়াবিন চাষের অনিশ্চয়তা দূর করে এটি নতুন আশার আলো দেখাবে।”
এ সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এটি বাংলাদেশের কৃষিতে যুগান্তকারী অর্জন। খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার ও কৃষকের জীবনে স্থিতিশীলতা আনয়নে এ জাত টেকসই কৃষির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।”
উল্লেখ্য, এ উদ্ভাবনের মাধ্যমে গাকৃবির মোট উদ্ভাবিত ফসলের জাতের সংখ্যা দাঁড়াল ৯৪-এ। এর আগে একই গবেষণা দল লবণ ও জলাবদ্ধতা-সহনশীল বৈশিষ্ট্যসহ আরও পাঁচটি উচ্চফলনশীল সয়াবিন জাত উদ্ভাবন করে সাফল্য অর্জন করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ প্রোটিন (৪০-৪৫%) ও তেলসমৃদ্ধ (১৮-২০%) হওয়ায় এ জাত পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি পোল্ট্রি শিল্পেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কারণ বীজে ট্রিপসিনের মাত্রা কম থাকায় প্রোটিন শোষণের হার বৃদ্ধি পায়।
খরা ও চরাঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে ‘জিএইউ সয়াবিন-৬’ ইতোমধ্যেই কৃষক ও কৃষিবিদদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
আপনার মতামত লিখুন :