একটি সিটি করপোরেশন, তিন মেয়র, কিন্তু কেউই পূর্ণ করতে পারেননি পাঁচ বছরের মেয়াদ—এমন বাস্তবতায় দীর্ঘদিন ধরে “অভিশপ্ত সিটি” তকমা বইছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত ও প্রশাসকদের হাতেই ঘুরেছে নগর শাসনের চাকা।
সর্বশেষ বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার—ফলে আবারও প্রশ্ন উঠেছে, এ নগর কি কখনও স্থিতিশীল জনপ্রতিনিধিত্ব পাবে?
প্রথম মেয়র, প্রথম ঝড়
২০১৩ সালের ৬ জুলাই প্রথম সিটি নির্বাচনে ১ লাখ ৬ হাজার ৬৬৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন বিএনপি নেতা অধ্যাপক এমএ মান্নান। আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খানকে হারিয়ে তিনি ১৮ আগস্ট দায়িত্ব নেন। কিন্তু মাত্র ১৮ মাসের মাথায় প্রশাসনিক ঝড়ে পদচ্যুত হন তিনি। ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান; দুই দফায় মোট ২২ মাস কারাভোগ করেন। তার বিরুদ্ধে হয়েছিল ২৯টি মামলা, বরখাস্ত হন দুইবার।
নগরবাসীর একাংশ মনে করেন, এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল। অধ্যাপক মান্নান ২০২২ সালের ২৮ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। তার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন আওয়ামী লীগ দলীয় কাউন্সিলর আসাদুর রহমান কিরণ, যিনি প্রায় পাঁচ বছর বিভিন্ন সময়ে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে এবং বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়; আদালত দুদককে তদন্তের নির্দেশ দেন। গত জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনা পলায়নের পর কিরণ এখন কারাবাস করছেন।
দ্বিতীয় মেয়রও টিকলেন না
২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। বিএনপি প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা হাসান উদ্দিন সরকারকে হারিয়ে তিনি নগরপিতার দায়িত্ব নেন। কিন্তু ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর একটি কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে দলীয় পদ ও মেয়র পদ—দুটিই হারান তিনি। আদালতের দ্বারস্থ হয়েও আর পদ ফিরে পাননি। ফলে দ্বিতীয় মেয়াদও পূর্ণতা পায়নি।
তৃতীয় বার নির্বাচনী পর্বে জাহাঙ্গীর আলমের মাতা স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুন (টেবিল ঘড়ি) মার্কা নৌকার প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খানের বিরুদ্ধে জয়ী হন। পরে গত বছরের ৫ আগস্টের পর তিনিও পদচ্যুত হন। জাহাঙ্গীর দেশ ত্যাগ করে পালিয়ে যান। আবারও প্রশাসকের হাতে চলে যায় সিটি করপোরেশন।
ভোটারদের দীর্ঘশ্বাস
গাজীপুর সিটির ভোটারদের আক্ষেপ—যাকে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত করা হয়, তিনি পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। ফলে নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা মাঝপথে থেমে যায়, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে, আর ভোগান্তি বাড়ে সাধারণ নাগরিকের।
২০১৩ সালে দেশের পাঁচ সিটির মধ্যে বরিশাল ছাড়া বাকি চার সিটির মেয়র বিভিন্ন অজুহাতে অপসারিত হন। গাজীপুরও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। ফলে প্রশ্ন উঠেছে আসন্ন চতুর্থ নির্বাচনে যিনি বিজয়ী হবেন, তিনি কি পূর্ণ পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন? তারা চান সুষ্ঠু নির্বাচন, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা।
এক প্রবীণ ভোটারের ভাষায়, “গাজীপুরে মেয়র বদলায়, কিন্তু সমস্যার বদল হয় না। আমরা শুধু চাই—একজন নির্বাচিত মেয়র যেন পাঁচ বছর কাজ করার সুযোগ পান।” অভিশপ্ত তকমা ঝেড়ে ফেলে কি এবার স্থিতিশীলতার পথে হাঁটবে গাজীপুর? নাকি আবারও নির্বাচিত মেয়র হবেন সাময়িক, আর সিটি চলবে ভারপ্রাপ্ত বা প্রশাসকের হাতেই—এই প্রশ্নই এখন নগরবাসীর মুখে মুখে।
আপনার মতামত লিখুন :