পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ্র আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এক ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
গত নভেম্বরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর দায়ের করা লিখিত অভিযোগে তার বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার সিন্ডিকেট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পাউবোর এই কর্মকর্তা আলোচিত বিসিএস প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের অভিযুক্ত আবেদ আলী-এর পথ অনুসরণ করছেন।
প্রশ্নফাঁস: নিয়োগ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভাঙার অভিযোগ
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শুভ্র আহমেদ ২০১৮ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পাউবোতে যোগ দেন। ২০১৯ সালেই তিনি মানবসম্পদ পরিদপ্তরের নিয়োগ শাখায় সংযুক্ত হন—যেখানে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, টাইপিং ও প্রিন্টিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ ছিল।
২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাউবোর নিয়োগ পরীক্ষা অভ্যন্তরীণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই সময় প্রশ্নপত্র টাইপিং ও প্রিন্টিংয়ের দায়িত্বে থেকে পরীক্ষার আগেই অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন সরবরাহ করা হয়েছে। একাধিক পরীক্ষার্থী ও দালালচক্রের মাধ্যমে এই প্রশ্নফাঁস সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
প্রশ্নফাঁস কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—এটি মেধাকে হত্যা করে এবং যোগ্যতাকে নির্বাসনে পাঠায়। একজন সরকারি প্রকৌশলীর হাতেই যদি প্রশ্নপত্র নিরাপদ না থাকে, তবে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় দাঁড়ায়—এ প্রশ্ন এখন উঠছে।
নিয়োগ শাখা: ব্যক্তিগত আয়ের কেন্দ্র?
অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগ শাখা শুভ্র আহমেদের কাছে কার্যত অবাধ অর্থ উপার্জনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। চাকরি পেতে যোগ্যতার চেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল অর্থ ও যোগাযোগ। এতে বহু যোগ্য প্রার্থী বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ। রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থার ওপর তরুণদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে অভিযোগকারীরা তাকে আবেদ আলী-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন—কৌশল ভিন্ন হলেও লক্ষ্য এক, নিয়োগ ব্যবস্থাকে লুটপাটের যন্ত্রে পরিণত করা।
পদোন্নতি ও নারায়ণগঞ্জে দুর্নীতির বিস্তার :
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব অভিযোগের মধ্যেই শুভ্র আহমেদ পদোন্নতি পান। অভিযোগ রয়েছে, মেধাক্রম উপেক্ষা করে বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী পদে উন্নীত হন—যা পাউবোর ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে দাবি করা হয়েছে।
পরবর্তীতে তাকে নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি টেন্ডার সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। পরিচালন খাতের টেন্ডার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের পাইয়ে দেওয়া এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বরাদ্দ অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগও রয়েছে।
বাস্তবতা কী বলছে? শুষ্ক মৌসুমেও নারায়ণগঞ্জের বহু এলাকায় জলাবদ্ধতা কমেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ হয়েছে কাগজে-কলমে—মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান ফল নেই।
দপ্তর পরিচালনায় অনিয়ম
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনে তিনি চরম উদাসীন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, অফিস সময়ে তাকে অধিকাংশ সময় পাওয়া যায় না। ব্যক্তিগত কাজে নিয়মিত অফিসের বাইরে থাকেন। সরকারি গাড়ি অফিস সময়ের পর ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এতে জ্বালানি ব্যয়সহ সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ।
আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ :
দুদকে দেওয়া অভিযোগে শুভ্র আহমেদের সম্পদের একটি বিস্তৃত তালিকা তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালে নিজ জেলা নওগাঁয় তিনি একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেন। ঢাকার কেরানীগঞ্জে রয়েছে ১,৮০০ বর্গফুটের একটি প্লট।
এ ছাড়া ঢাকা ও গাজীপুরে তার নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি, খামার এবং একটি রিসোর্টে শেয়ার থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের কথাও অভিযোগে উঠে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে—একজন সরকারি প্রকৌশলীর বৈধ আয়ে এসব সম্পদ অর্জন কীভাবে সম্ভব?
রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ :
অভিযোগে বলা হয়েছে, শুভ্র আহমেদ নিজেকে সাবেক পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক-এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিতেন। এ পরিচয়ই ছিল তার সবচেয়ে বড় ঢাল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। প্রভাবের কারণে দীর্ঘদিন কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় যদি দুর্নীতির লাইসেন্সে পরিণত হয়, তবে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি কোথায় দাঁড়ায়—এ প্রশ্ন এখন অনিবার্য।
এ অভিযোগ যদি আংশিক সত্যও হয়, তবে প্রশ্ন কেবল একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে নয়—কীভাবে তিনি সাত বছর একই নিয়োগ শাখায় বহাল থাকলেন? পদোন্নতির সময় যাচাই-বাছাই কোথায় ছিল? টেন্ডার ও সম্পদের বিষয়গুলো এতদিন নজরের বাইরে থাকল কীভাবে?
দুদকের জন্য এটি শুধু একটি অভিযোগ নয়—রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থার আস্থার প্রশ্ন। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান তদন্ত ছাড়া সেই আস্থা ফিরবে না। অভিযোগ সত্য হলে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই সময়ের দাবি।
আপনার মতামত লিখুন :