কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলা অধীন দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন দ্বীপ-এ চলমান বঙ্গবন্ধু সড়ক সংস্কার প্রকল্পকে ঘিরে উঠেছে অনিয়ম, দায়সারা কাজ এবং প্রশাসনিক নীরবতার গুরুতর অভিযোগ। এই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এলজিইডির কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাদেকুজ্জামান সাদেক এবং টেকনাফ উপজেলা প্রকৌশলী রবিউল হোছাইন।
স্থানীয় সূত্র, ঠিকাদারি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে—প্রায় ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকার গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক সংস্কার প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, তদারকির ঘাটতি এবং প্রশাসনিক দায় এড়ানোর প্রবণতা প্রকল্পটিকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
সেন্টমার্টিন থেকে গলাচিপা হয়ে ছেঁড়াদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত এই সড়কটি দ্বীপের অন্যতম প্রধান যোগাযোগ পথ। পর্যটন, স্থানীয় জীবনযাত্রা এবং জরুরি যাতায়াতের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন অবহেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে সড়কটি সংস্কারের অনুমোদন দেওয়া হয়। দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান ও বর্ষা মৌসুমের কারণে বছরের নির্দিষ্ট সময় সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে।
প্রাথমিক পর্যায়ে কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক মনে হলেও প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটি হঠাৎ স্থবির হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ রাখে। তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন খান একাধিকবার লিখিতভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করেন এবং কাজ সম্পন্ন না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন।
কিন্তু ২০২৫ সালের শেষের দিকে তার বদলির পর দায়িত্ব নেন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাদেকুজ্জামান সাদেক। এরপরই পুনরায় কাজ শুরু হলেও সেই কাজের মান নিয়ে শুরু হয় প্রশ্ন।
স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পে অনুমোদিত মানসম্পন্ন কনকর্ড কোম্পানির ব্লকের পরিবর্তে ইটের খোয়া ও সাগরের বালু ব্যবহার করে নিম্নমানের ব্লক তৈরি করা হচ্ছে। এই ব্লক দিয়েই রাস্তার সংস্কার কাজ চালানো হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় ঠিকাদারি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, এই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের পেছনে প্রশাসনিক স্তরে যোগসাজশ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাদেকুজ্জামান সাদেক এবং উপজেলা প্রকৌশলী রবিউল হোছাইনের তদারকিতে কাজ হলেও বাস্তবে মান নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, সড়কের বিভিন্ন অংশে ব্যবহৃত ব্লকগুলো দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে এবং স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কাজ শেষ হওয়ার আগেই অনেক স্থানে ব্লকের ক্ষয় দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সড়কটির স্থায়িত্ব নিয়ে বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
এই বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাদেকুজ্জামান সাদেকের কাছে অভিযোগ উপস্থাপন করা হলে তিনি বলেন, অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তদন্ত বা সরাসরি তদারকির বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট পদক্ষেপের কথা জানাননি।
অন্যদিকে উপজেলা প্রকৌশলী রবিউল হোছাইনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে প্রথমদিকে তিনি সাড়া দেননি। একাধিকবার যোগাযোগের পর তিনি কিছু সাধারণ তথ্য দিলেও সেন্টমার্টিনের সড়ক সংস্কার কাজে অনিয়মের অভিযোগ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
অভিযোগ রয়েছে, শুধু সেন্টমার্টিন নয়—টেকনাফের অন্যান্য সড়ক প্রকল্পেও একই ধরনের অনিয়মের আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি উখিয়া উপজেলা, মহেশখালী উপজেলা এবং কক্সবাজার সদর-এর কিছু প্রকল্পেও তথ্য গোপনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রকৌশলীদের অনেকেই ফোন রিসিভ করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানানো হলেও তিনি সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেননি। বরং তিনি অধীনস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। এতে প্রশাসনিক দায় এড়ানোর প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, দ্বীপের ভৌগোলিক বাস্তবতায় একটি সড়ক নির্মাণ বা সংস্কার প্রকল্প শুধু উন্নয়ন নয়—এটি দ্বীপবাসীর জীবনরেখা। পর্যটন নির্ভর অর্থনীতি, জরুরি চিকিৎসা পরিবহন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এই সড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ হলে তা শুধু অর্থ অপচয় নয়, বরং ভবিষ্যতে বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সচেতন মহল মনে করছেন, প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসাজশ এবং তথ্য গোপনের সংস্কৃতি—এই তিনটি বিষয় মিলেই প্রকল্পটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
তারা মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কারিগরি অডিট, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই এবং প্রশাসনিক দায় নির্ধারণ জরুরি। দ্বীপের পরিবেশগত সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিম্নমানের নির্মাণ ভবিষ্যতে ক্ষয়, ভাঙন এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষায়, “রাস্তা হচ্ছে, কিন্তু টিকবে কি না—সেই নিশ্চয়তা নেই।” এই বাস্তবতায় নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাদেকুজ্জামান সাদেক এবং উপজেলা প্রকৌশলী রবিউল হোছাইনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
দ্বীপবাসী এবং স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, দায়সারা তদন্ত নয়—স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ের তদন্তই এখন সময়ের দাবি।কারণ সেন্টমার্টিন শুধু একটি দ্বীপ নয়—এটি দেশের পর্যটন, পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক পরিচয়ের অংশ। আর সেই দ্বীপের জীবনরেখা যদি অনিয়মের ভারে দুর্বল হয়ে পড়ে, তার দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই।
আপনার মতামত লিখুন :