দারোয়ান হিসেবে চাকরি করতেন মো. রফিক। তাঁর ছেলে জয়নাল আবেদীন টুটুল। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নে তাঁদের গ্রামের বাড়ি। রফিকের মৃত্যুর পর টুটুল ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ ভিত্তিতে দৈনিক ৫৫ টাকায় যমুনা অয়েল কোম্পানি-এর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে ক্যান্টিন কর্মচারী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
২০০৫ সালে চতুর্থ শ্রেণির সাধারণ কর্মচারী হিসেবে তাঁর চাকরি স্থায়ী হয়। পরে পদোন্নতি পেয়ে গেজার (অপারেটর) হন। তেল কোম্পানিতে গেজার মূলত তেল পরিমাপের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন—তামা বা লোহার কাঠি কিংবা যন্ত্রের মাধ্যমে তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই পদে যোগ দেওয়ার পরই টুটুলের আর্থিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হন।
২০১৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপ চলাকালে নারায়ণগঞ্জে একটি বাড়ি আলোচনায় আসে। ছয়তলা ভবনটি ব্রাজিলের পতাকার রঙে সাজানো হয়। ভবনটি দেখতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত-ও যান। বাড়িটির মালিক টুটুল। অভিযোগ আছে, কর্মস্থল নারায়ণগঞ্জে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিশাল সম্পদ গড়ে তোলেন।
একই সময়ে তিনি যমুনা অয়েলের সিবিএ কার্যকরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এর সুবাদে ফতুল্লা ডিপোর কার্যত নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন টুটুল। তাঁর প্রভাবের কারণে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন মহলও নানা অনিয়ম দেখেও নীরব থাকতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি আত্মগোপনে যান। কিন্তু কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও নিয়মিত হাজিরা চলতে থাকে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফতুল্লা ডিপোতে সোয়া লাখ লিটার তেল গায়েবের ঘটনায়ও টুটুলের নাম উঠে আসে। নিজে উপস্থিত না থেকেও ডিপোর ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা। ডিপোতে তাঁর নিজস্ব অফিস রয়েছে, যেখান থেকে সিসিটিভির মাধ্যমে কার্যক্রম তদারকি করা হতো বলে অভিযোগ।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)-এর তদন্ত কমিটিকে দেওয়া বক্তব্যে যমুনা অয়েলের ফতুল্লা ডিপোর অপারেশন কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন বলেন, জয়নাল আবেদীন টুটুল পাম্প হাউজ পরিচালনা করতেন। ২২ নম্বর ট্যাংকে একটি রিসিভিং, একটি আইটিটি (ইন্টার ট্যাংক ট্রান্সফার) এবং একটি কোস্টাল ট্যাংকার ডেলিভারি লাইন রয়েছে। ট্যাংকের ক্যালিব্রেশন, মজুত, ডেলিভারি ও রিসিভিংয়ের হিসাব টুটুলের তত্ত্বাবধানে হতো। ডিপোর অধিকাংশ অস্থায়ী কর্মীও তাঁর আওতাধীন ছিলেন।
তিনি আরও জানান, মিটারিং স্টেশনের স্বয়ংক্রিয় লিভার অকার্যকর ছিল এবং কর্মকর্তাদের সেখানে অবাধ যাতায়াত করতে দেওয়া হতো না। মিটারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ টুটুলের নির্দেশনায় সম্পন্ন হতো বলে দাবি করেন তিনি।
অস্থায়ী গেজার মোহাম্মদ ইকবাল তদন্ত কমিটিকে বলেন, সিডিপিএল থেকে ডিজেল গ্রহণের সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন। ট্যাংকের ডিপ গ্রহণের পর মৌখিকভাবে টুটুল ও ডিপো সুপারকে অবহিত করতেন।
মিটারম্যান আবুল কালাম আজাদ জানান, মিটারিং পয়েন্টের স্বয়ংক্রিয় লিভার দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
কললিস্টে ভিন্ন চিত্র
প্রতিদিনের কাগজ -এর হাতে আসা টুটুলের ব্যবহৃত গ্রামীণফোন নম্বরের ৩৯ দিনের কললিস্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, উল্লিখিত সময়ে তাঁর মোবাইলের অবস্থান ছিল ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়; ফতুল্লা ডিপো এলাকায় অবস্থান পাওয়া যায়নি। তবে এই সময়ে বিভিন্ন ডিপোর কর্মকর্তা ও অয়েল ট্যাংকার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের প্রমাণ মিলেছে।
হাজিরা খাতা বাসায় যাওয়ার অভিযোগ:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, টুটুল কর্মস্থলে না গেলেও হাজিরা খাতা গুলশানের বাসায় নেওয়া হতো এবং তিনি সেখানে স্বাক্ষর করতেন। নিয়মিত বেতন-ভাতাও তুলেছেন বলে দাবি তাঁদের।
গত বছরের ১৯ আগস্ট টুটুলের আলোচিত ‘ব্রাজিল বাড়ি’তে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, টুটুলকে সেসময় অফিসে পাওয়া যায়নি। নথিতে হাজিরা থাকলেও বাস্তবে অনুপস্থিত ছিলেন বলে উল্লেখ করেন তাঁরা।
দুদকের তথ্যমতে, বাড়িটির জমি তাঁর বাবার নামে কেনা ছিল। ভবন নির্মাণে আনুমানিক দেড় কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পাশাপাশি টুটুল ও তাঁর স্ত্রীর নামে জাহাজ, ট্যাংক লরি ও ব্যক্তিগত গাড়ির তথ্যও উঠে আসে।
তদন্ত কমিটির সুপারিশ :
বিপিসির তদন্তে ফতুল্লা ডিপোতে টুটুলের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি উল্লেখ করে বদলি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. জাহিদ হোসাইন বলেন, প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে।
টুটুলের বক্তব্য :
তদন্ত কমিটিকে দেওয়া বক্তব্যে টুটুল দাবি করেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তিনি ট্যাংকে উঠতে পারেন না এবং লোকসানের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য
যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ বলেন, “আমরা এজিএম নিয়ে ব্যস্ত আছি। পরে প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া
আপনার মতামত লিখুন :