দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে ওঠা মোংলা বন্দর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই নজিরবিহীন গতিতে এগোচ্ছে। অর্থবছরের মাত্র সাত মাসের হিসাব অনুযায়ী কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বন্দরের অর্জন গত বছরের পুরো সময়ের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এতে দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে মোট ৩১টি বিদেশি কন্টেইনারবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়েছে। এসব জাহাজ থেকে মোট ২১ হাজার ৬৫১ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো ১২ মাসে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৪৫৬ টিইইউস। অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হতে এখনো পাঁচ মাস বাকি থাকতেই আগের বছরের মোট অর্জন অতিক্রম করেছে বন্দরটি।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৯ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সামগ্রিক কার্গো পরিবহনেও এসেছে উল্লেখযোগ্য গতি। সাত মাসে মোট ৫১৫টি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ বন্দরে এসেছে এবং এসব জাহাজ থেকে ৮২ লাখ ৬৬ হাজার মেট্রিক টন পণ্য ওঠানামা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আমদানি হয়েছে ৬ হাজার ৪০৪টি রিকন্ডিশন গাড়ি। এতে বোঝা যাচ্ছে, বন্দরের ওপর আমদানিনির্ভর শিল্প ও ব্যবসার চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ব্যবহারকারীর আস্থাও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়নই এই সাফল্যের মূল চালিকা শক্তি। পশুর চ্যানেলের নাব্যতা বৃদ্ধি, আধুনিক ক্রেন ও সরঞ্জাম সংযোজন এবং দ্রুত খালাস ব্যবস্থার কারণে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমেছে। ফলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে বন্দরের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে বিকল্প বন্দর ব্যবহারের কথা ভাবতে হলেও এখন সরাসরি এখানেই পণ্য আনা-নেওয়া বেশি সুবিধাজনক।
নীতিগত পরিবেশও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর ব্যবসায়ী মহলে নতুন বিনিয়োগ ও কার্যকর নীতি সহায়তার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, ধারাবাহিক সহায়তা অব্যাহত থাকলে বন্দরটি আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মো. মাকরুজ্জামান বলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই গত বছরের মোট লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির স্পষ্ট প্রমাণ। সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর অপারেশনের কারণে জাহাজ পরিচালনা ও পণ্য ওঠানামা দ্রুত হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে নতুন রেকর্ড গড়া সম্ভব বলেও জানান তিনি।
মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকার আলীর মতে, জাহাজ খালাসের সময় কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা সময় ও খরচ দুই দিক থেকেই লাভবান হচ্ছেন। আগে যেখানে একটি জাহাজের খালাসে অতিরিক্ত সময় লাগত, এখন সেই সময় অনেক কমেছে। এতে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছেও বন্দরের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।
শ্রমিক নেতা কাজী ওমর ফারুক বলেন, জাহাজ ও কার্গোর সংখ্যা বাড়ার ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবহন,গুদামজাতকরণ, লজিস্টিকস ও শ্রমনির্ভর নানা খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে। বন্দরের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় আশপাশের এলাকায় নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে এবং স্থানীয় বাজারে অর্থের প্রবাহও বেড়েছে।
বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে সম্প্রতি সুন্দরবন সংলগ্ন হিরণ পয়েন্ট এলাকায় এইচপি-১, এইচপি-২ ও এইচপি-৩ নামে তিনটি নতুন অপারেশনাল অ্যাঙ্কর বার্থ চালু করা হয়েছে। এসব বার্থে ইতোমধ্যে ৯ মিটার ড্রাফটের ১৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ সফলভাবে অপারেশন সম্পন্ন করেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন থেকে সর্বোচ্চ ২০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ এসব বার্থে নিরাপদে কার্গো কার্যক্রম চালাতে পারবে। এর ফলে বড় জাহাজ পরিচালনায় সক্ষমতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি হবে।
বর্তমানে এই বন্দর দিয়ে চাল, গম, সার, ক্লিংকার, কয়লা, তেল, এলপিজি ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আমদানি হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে সাদা মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, পাটজাত পণ্য এবং হিমায়িত খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়মিত রপ্তানি করা হচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বন্দরটি শুধু আমদানিনির্ভর নয়, বরং রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম বলেন, “বন্দরের এই অগ্রগতি কেবল পরিসংখ্যানের উন্নতি নয়, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতা এখন দৃশ্যমান ফল দিচ্ছে। আগে যে সীমাবদ্ধতার কথা বলা হতো, এখন সেই জায়গাগুলো কাটিয়ে উঠে বন্দরটি নতুন আস্থার কেন্দ্র হয়ে উঠছে।” তার মতে, কার্যক্রম বাড়ার ফলে স্থানীয় বাজার, পরিবহন খাত এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
নৌ-বাণিজ্য বিশ্লেষক নুর আলম শেখ মনে করেন, এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে নিয়মিত ড্রেজিং, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা এবং দ্রুত কাস্টমস সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিপিং রুট বাড়ানো গেলে বৈদেশিক বাণিজ্যে অবদান আরও বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরো বলেছেন, ভৌগোলিক অবস্থান ও নৌপথ সুবিধা কাজে লাগাতে পারলে ভবিষ্যতে এই বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে সাত মাসের এই পরিসংখ্যান সামুদ্রিক বাণিজ্যের সম্ভাবনার শক্ত বার্তা। পরিকল্পিত উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে বছর শেষে অর্জনের নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বন্দরটি, এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।
আপনার মতামত লিখুন :