বান্দরবানে ৭২০ কোটি খাদ্যশস্য প্রকল্পের দুর্নীতিতে অভিযুক্ত থাকা দুদকের প্রাথমিক মামলার তদন্তে আসামী বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের হিসাব রক্ষক উসাজাই বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনো রকম আইননী ব্যবস্থা না নিয়ে তাঁকে খাদ্যশস্য প্রকল্পের বহাল রাখায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে সোচ্চার থাকা জেলা পরিষদের সদস্য, কর্মকর্তা, কর্মচারীগণ প্রধান উপদেষ্টা বরাবর চিঠি লিখবেন বলে বিশ্বস্ত একটি সূত্রে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৬ বছরে বান্দরবান জেলা পরিষদে খাদ্যশস্য প্রকল্পের আওতায় চাল বরাদ্দ এসেছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন এবং গম বরাদ্দ এসেছে প্রায় ৮০ হাজার টন। গড়ে চালের দাম প্রতি টন ৪০ হাজার টাকা হিসেবে ধরা হলে এর মূল্য দাঁড়ায় ৪৮০ কোটি টাকা। আর গমের দাম প্রতি টন ৩০ হাজার টাকা হিসেবে ধরলে মূল্য দাঁড়ায় ২৪০ কোটি টাকা। চাল ও গম মিলে সর্বমোট বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭২০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্প কাগজপত্রে সব ঠিক রেখে ভূঁতুড়ে প্রকল্প তৈরি করে এই বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আত্মসাৎ করা হয়, যার মূল হোতা হিসেবে সাবেক চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা ও হিসাবরক্ষক উসাজাইয়ের নাম উঠে আসে।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বান্দরবান জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লাসহ অন্যান্য সদস্যরা গা-ঢাকা দেন। এতে পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পদ শূন্য হয়ে পড়ে। এরপর ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সিনিয়র সহকারী সচিব তাসলিমা বেগম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক থানজামা লুসাইকে চেয়ারম্যান এবং ১৪ জন সদস্যকে নিয়োগ দেয় অন্তবর্তীকালীন সরকার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলা পরিষদ সদস্য জাগ্রত পাহাড়’কে বলেন, “আওয়ামী লীগ আমলে জনগণ খাদ্যশস্য প্রকল্প সম্পর্কে কিছুই জানতো না। কারণ সাবেক চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা ও হিসাবরক্ষক উসাজাই ভুয়া কাগজপত্র ও প্রকল্প দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সরকার পতনের পর ক্যশৈহ্লা বিদেশে পালিয়ে গেলেও উসাজাই এখনো কীভাবে খাদ্যশস্য প্রকল্পে সক্রিয়, সেটা আমরা কেউই বুঝে উঠতে পারছি না। তাঁর বিরুদ্ধে ৭২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের মামলা চলমান, অথচ এখনও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিষদের প্রকল্প শাখার এক কর্মচারী বলেন, “উসাজাই স্যার সবাইকে ম্যানেজ করতে পারেন, এজন্যই টিকে আছেন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তিনি নিজেই প্রকল্প থেকে অব্যাহতি চাইছিলেন…, কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যানের সিএ মোতালেব তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আবারও আগের মতো কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। চেয়ারম্যান স্যারের উচিত তাঁদের দুজনকে প্রকল্প দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া, নইলে স্যারের বদনাম হবে।”
আরেক কর্মকর্তা বলেন, “চেয়ারম্যান থানজামা লুসাই স্যারকে আমি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করি, তিনি অতীতেও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু দায়িত্বে আসার এক বছর পেরিয়ে গেলেও উসাজাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া সবাইকে অবাক করেছে।”
চেয়ারম্যানের অফিসে কর্মরত একজন কর্মচারী বলেন, “অধ্যাপক থানজামা লুসাই স্যার সত্যিকারের সৎ ও কাজপাগল মানুষ। আগের চেয়ারম্যানের আমলে মানুষ তাঁর রুমে ঢুকতেও ভয় পেত। এখন মানুষ তাঁদের সুবিধা-অসুবিধার কথা বলতে পারছে এবং স্যার সহযোগিতা করছেন। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়, উসাজাই-এর মতো দুর্নীতিবাজ কীভাবে এখনও খাদ্যশস্য প্রকল্প সামলাচ্ছেন?”
এই বিষয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের হিসাবরক্ষক উসাজাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও জাগ্রত পাহাড়ের প্রতিবেদক তাঁর কোনো উত্তর পাননি।
অন্যদিকে, চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই জাগ্রত পাহাড় এর প্রতিবেদককে মুঠোফোনে বলেন, “উসাজাইয়ের বিরুদ্ধে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নানা অভিযোগ পেয়েছি। আমি অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। তবে কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি তা এখনই মিডিয়ার সামনে বলা সম্ভব নয়।”
আপনার মতামত লিখুন :