দুদকের ফাইলে আটকে থাকা দুর্নীতি: নুরুজ্জামান ইস্যুতে প্রশ্নের ঝড়

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ৩১ মার্চ, ২০২৬, ১১:৫০ এএম

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কাস্টমস কমিশনার একেএম নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিকালীন সময়ে নানা অপকর্মে জড়ালেও প্রভাব খাটিয়ে সেগুলো ধামাচাপা দিয়ে দীর্ঘদিন আয়েশি জীবনযাপন করেছেন তিনি। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের হওয়া একাধিক অভিযোগের তদন্তও বছরের পর বছর ঝুলে আছে বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার শৈলঢুবি গ্রাম তার প্রকৃত ঠিকানা হলেও তিনি নিজেকে গোপালগঞ্জের পরিচয়ে পরিচিত করতেন। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি দীর্ঘদিন বিতর্ক এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০০৯ সালে ঢাকা দক্ষিণে কর্মরত থাকাকালে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরে ২০১৩ সালে কমলাপুর আইসিডিতে দায়িত্ব পালনকালে নিয়োগে অনিয়ম ও গুড়া দুধ কেলেঙ্কারিতে জড়ানোর অভিযোগে সমালোচিত হন। তবে প্রভাব খাটিয়ে ওই সময়ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এড়ান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন স্থলবন্দর থেকে রাজধানীর ইসলামপুর ও নয়াবাজারে চোরাই পণ্যের সিন্ডিকেটকে সহায়তা দিতেন তিনি। রাজস্ব বিভাগের বন্ড কমিশনারেট, শুল্ক গোয়েন্দা ও সিআইডির একাধিক অনুসন্ধানেও এ ধরনের তথ্য উঠে এলেও তা কার্যকরভাবে এগোয়নি।

২০১৭ সালের ২০ আগস্ট পুরান ঢাকার গুলশান আরা সিটি মার্কেট এলাকায় বিপুল পরিমাণ চোরাই পণ্য উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে শতকোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির তথ্য পাওয়া যায়। একইভাবে ২০১৩ সালে নারায়ণগঞ্জ ও আদমজী ইপিজেড কেন্দ্রিক একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভুয়া নথিতে পণ্য আমদানির মামলাতেও তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের শুল্ক ফাঁকি ও চোরাকারবার সংক্রান্ত তদন্তেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে আসে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযুক্তদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি এসব কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১১ সালে ঢাকা পূর্ব বন্ড কমিশনারেটে এবং ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত অবস্থায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন তিনি। চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে কয়েকশ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

২০২২ সালে পানগাঁও কাস্টমসে সিগারেট ও মদের কন্টেইনার গায়েবের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তিনি আসামি হন। এ মামলা বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে কাপড়ভর্তি কন্টেইনার চুরির ঘটনাতেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবনে নুরুজ্জামানের অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি, গাড়িসহ বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় তার স্ত্রীর নামে একটি গার্মেন্টস রয়েছে। তিনি বর্তমানে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বসবাস করেন।

এ বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আখতারুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই, তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে বিস্তারিত জানা যাবে।

অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং এতে উচ্চ পর্যায়ের প্রভাব রয়েছে। এ কারণেই তদন্ত দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, “রাজস্ব সংশ্লিষ্ট কোনো অনিয়ম আমরা মেনে নেব না। অতীতের অভিযোগগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

Advertisement

Link copied!