হাম নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। আতঙ্ক আখেরে ভালো কিছু বয়ে আনে না। বরং সচেতনতা ও প্রত্যেকের সামান্য পড়াশোনা সবচেয়ে কার্যকর হবে। একজন অভিভাবকের যা যা জানা প্রয়োজন এ সম্পর্কে একটি নোট সহজ ভাষায় নিচে প্রকাশ করছি। আগ্রহীরা পড়ে নিতে পারেন।
১. হাম কি ছোঁয়াচে?
হ্যাঁ, এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। একজন হাম আক্রান্ত ব্যক্তি ১২-১৮ জন সুস্থ ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারে।
হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা বাতাস এবং ড্রপলেটের মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি থেকে এবং কথা বলার সময় এটি সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এই ভাইরাস বাতাসে বা কোনো বস্তুর ওপর প্রায় দুইঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লক্ষণ দেখা দেয় না। সাধারণত শরীরে ভাইরাস প্রবেশের ১০-১৪ দিন পর প্রথম লক্ষণ প্রকাশ পায়।
২. প্রাথমিক লক্ষণ কী কী?
আমরা 3C দিয়ে মনে রাখি
1. Cough (তীব্র কাশি)
2. Coryza (সর্দি বা নাক দিয়ে অনবরত পানি পড়া)
3. Conjunctivitis (চোখ লাল হওয়া বা চোখ ওঠা
এছাড়াও:
- তীব্র জ্বর।
- মুখে বা গলায় অস্বস্তি।
- মুখের ভেতর ফোলা অংশের মতো (লবণের দানার মতো সাদা সাদা) 'কপ্লিক স্পট' দেখা দেওয়া।
- ৩-৪ দিন পর সাধারণত কানের পেছন ও মুখমণ্ডল থেকে র্যাশ শুরু হয়ে ধীরে ধীরে নিচের দিকে বুক, পিঠ ও হাত-পায়ে ছড়িয়ে পড়ে।
৩. কারা বেশি ঝুঁকিতে আছে?
পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু এবং গর্ভবতী নারীদের জন্য হাম বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করে।
গর্ভাবস্থায় হাম হলে গর্ভপাত, অকাল প্রসব (Pre-term birth) বা নবজাতকের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ার মতো জটিল ঝুঁকি থাকে।
৪. জটিলতা কী কী হতে পারে?
হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৩০ ভাগের গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন :
- নিউমোনিয়া (হামে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ)
- কানে ইনফেকশন
- ডায়রিয়া
- অন্ধত্ব
- মস্তিষ্কে প্রদাহের (Encephalitis) মতো মারাত্মক জটিলতা হতে পারে
হাম হওয়ার অনেক বছর পর (৭-১০ বছর) এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় SSPE বলা হয়।
৫. প্রতিরোধের উপায় কী?
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ উপায় হলো MR (Measles-Rubella) টিকা নেওয়া। সরকারি রুটিন টিকাদান কর্মসূচিতে এটি বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
বেসরকারিভাবেও দেওয়া যায়। MMR (Measles-Mumps-Rubella) ভ্যাকসিন। চাইলে বড়োরাও এই ভ্যাকসিন নিতে পারে।
৬. টিকা কখন দিতে হয়?
সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিতে হয়। একটি ডোজও মিস করা যাবে না।
এটি বাংলাদেশ সরকারের EPI শিডিউলের অন্তর্ভুক্ত।
তবে বর্তমানের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার ৬ মাস বয়সিদেরও এই টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। (আসন্ন এই ক্যাম্পেইনে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি সকল শিশুকেই হামের টিকা দেওয়া হবে। এমনকি আগে পূর্ণাঙ্গ/অপূর্ণাঙ্গ ডোজ দেওয়া থাকলেও। )
এই প্রসঙ্গে কয়েকটি কৌতুহলের জবাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
কেন এই টিকাটি ৯ মাসে গিয়ে দেওয়া হয়? যেখানে আরও বেশ কিছু টিকা আগেই দিয়ে ফেলা হয়?
জন্মের সময় শিশু তার মায়ের শরীর থেকে প্লাসেন্টার মাধ্যমে হাম প্রতিরোধের প্রাকৃতিক অ্যান্টিবডি নিয়ে জন্মায়। এই অ্যান্টিবডিগুলো শিশুকে জীবনের প্রথম কয়েক মাস সুরক্ষা দেয়।
আগে দেওয়া হয় কি?
হ্যাঁ, যদি কোনো এলাকায় হামের ব্যাপক আউটব্রেক দেখা দেয়, তবে অনেক সময় চিকিৎসকরা ৬ মাস বয়সেই একটি অতিরিক্ত ডোজ দেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে সেটিকে 'জিরো ডোজ' ধরা হয় এবং নিয়ম অনুযায়ী ৯ মাস পূর্ণ হলে আবার নিয়মিত ডোজ দিতে হয়।
কেনো দ্বিতীয় ডোজ?
প্রথম ডোজে প্রায় ৮৫-৯০% সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। বাকি ১০-১৫% ক্ষেত্রে যেন কোনো ঝুঁকি না থাকে, সেজন্য ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ বা বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়।
মনে রাখতে হবে, এই টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ। এর সঙ্গে অটিজম বা প্রতিবন্ধত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। কন্সপিরেসি থিওরি বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এই মুহূর্তে যারা ছড়াবে তাদেরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে হবে ও বর্জন করতে হবে।
টিকা দেওয়ার পরেও কি হাম হতে পারে?
হ্যাঁ, পারে। বলা হয়, হামের টিকা প্রায় ৯০-৯৫% কার্যকর। তবে যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, দীর্ঘমেয়াদি অসুখে ভোগে তাদের ক্ষেত্রে টিকা নেয়া থাকলেও হাম হতে পারে। তবে আশার বিষয় এই যে, টিকা নেয়া থাকলে সাধারণত হামের জটিলতা বেশ কম হয়।
৭. ভিটামিন-এ এর ভূমিকা কী?
ভিটামিন এ মিজেলস প্রতিরোধ করতে পারে না। তবে মিজেলস হলে পরে ভিটামিন এ দেবার ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ উভয়েই রিকমেন্ড করেছে।
মিজেলস চোখে বড়ো ধরনের ক্ষতি করতে পারে। এমনকি অন্ধত্ব পর্যন্ত। এই চোখের জটিলতা কমাতে ভিটামিন এ-এর ভূমিকা রয়েছে।
WHO recommended dosing :
<6 months: 50,000 IU
6–11 months: 100,000 IU
≥12 months: 200,000 IU (for 2 days)
৮. আক্রান্ত শিশুর যত্ন কিভাবে নিতে হবে?
শিশুকে প্রচুর পরিমাণে পানি, তরল খাবার এবং পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। এসময় শিশুর ক্ষুধামন্দা থাকে, ইরিটেটেড থাকে, কিছুই খেতে ভালো লাগে না।
তাই খেতে না চাইলেও লিকুইড খাবার যেমন- পানি, ডাবের পানি, ফলের রস, দুধ ইত্যাদি দিতে হবে যেন শিশুর ডিহাইড্রেশান না হয়ে যায়। বারবার অল্প অল্প করে খাবার দিতে হবে।
হাম হলে অনেকে শিশুকে গোসল করান না বা খাবারে নিষেধ করেন। এটি ভুল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং সব ধরণের স্বাভাবিক খাবার খাওয়া দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।
র্যাশ থাকা অবস্থায় শিশুকে অন্যান্য শিশু থেকে আলাদা রাখা (আইসোলেশন) জরুরি যাতে রোগটি না ছড়ায় র্যাশ ওঠার পর অন্তত পাঁচ দিন। মূলত র্যাশ ওঠার চারদিন আগে থেকেই রোগী এই ভাইরাসটি অন্যদের মধ্যে ছড়ানো শুরু করে।র্যাশ ওঠার আরও চারদিন পর্যন্ত ছড়াতে থাকে।
হাঁচি-কাশির এটিকেট মেনে চলতে হবে। নাক মুখ ঢেকে হাঁচি-কাশি দিতে হবে। বারবার হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। অনেকটা কোভিডের সময় যেরকম সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল তেমনটাই। এছাড়াও-
-ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি জীবাণুমুক্ত করে রাখতে হবে।
-বাচ্চার চোখের দিকে খেয়াল রাখতে হবে যে তার দেখতে কোনো অসুবিধে হচ্ছে কি-না।
-হাম আক্রান্ত শিশু স্কুলে যাবে না। এমনকি পরীক্ষা থাকলেও যাবে না। এছাড়া অন্যান্য জনসমাগমও পরিহার করতে হবে।
-জ্বর কমিয়ে রাখতে হবে। ওজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল দিতে হবে। গা মুছিয়ে দিতে হবে। গোসল করানো যাবে।
-হাম যেহেতু ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এখানে অ্যান্টিবায়োটিকের রোল নেই। তবে হ্যাঁ, সেকেন্ডারি ইনফেকশান থাকলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করতে পারেন।
৯. কখন দ্রুত হসপিটালে যেতে হবে?
- যদি শিশুর শ্বাসকষ্ট হয়
- খিঁচুনি দেখা দেয়
- বারবার বমি হয়
- প্রস্রাব কমে যায়
- শিশু একদম নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।
তবে আশার বিষয় হচ্ছে বেশিরভাগ হাম রোগীর চিকিৎসা বাসায়ই সম্ভব। হামের যদি কোনো জটিলতা না দেখা দেয় তাহলে এটি তেমন ক্ষতিকর হয় না।
১০. একবার হাম হলে কি আবার হতে পারে?
একবার হাম হয়ে গেলে শরীর আজীবনের জন্য এই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। অর্থাৎ, সাধারণত জীবনে একবার হাম হলে দ্বিতীয়বার হবার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
বলা হয়, একটি সমাজের অন্তত ৯৫% মানুষকে টিকা দিলে হামের বিস্তার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব। এটিকে হার্ড ইমিউনিটি বলা হয়। টিকাদানে অবহেলা করলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব মারাত্মকভাবে দেখা দেয়।
আমাদের পরিচিত একটি শিশুও যেন টিকা থেকে বাদ না পড়ে।
সংক্রামক ব্যাধিগুলো কেবলমাত্র নিজে সচেতন হয়ে প্রতিরোধ করা প্রায় অসম্ভব। সোসাইটির সবাই সচেতন হলেই কেবল সম্ভব। তাই আমাদের নিজেদের স্বার্থেই অন্যদের সচেতন করতে হবে।
লেখক: ডা. মারুফ রায়হান খান
৩৯তম বিসিএসের চিকিৎসক
মুগদা মেডিকেল কলেজ হসপিটাল
আপনার মতামত লিখুন :