বাংলার পলিমাটি আর কৃষকের ঘাম—এই দুইয়ের মিলনেই রচিত হয়েছে এই ভূখণ্ডের হাজার বছরের ইতিহাস। আদিকাল থেকেই কৃষি এদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। শাসক ও শাসিত, রাজা ও প্রজা—সবারই কেন্দ্রে ছিল এই কৃষি। সময়ের আবর্তনে শাসনামল বদলেছে, কিন্তু কৃষির গুরুত্ব কমেনি। সম্রাট আকবর থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান সময়ের অগ্রপথিক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—প্রত্যেকের রাজনৈতিক দর্শনে কৃষি ও কৃষক ছিল অনন্য উচ্চতায়। এই প্রবন্ধটি সম্রাট আকবরের সেই বৈজ্ঞানিক রাজস্ব সংস্কার থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের প্রযুক্তি-নির্ভর কৃষি বিপ্লবের এক তুলনামূলক ও গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণ।
১. সম্রাট আকবর ও বাংলা সনের কৃষি-দর্শন: একটি বৈজ্ঞানিক পুনর্পাঠ
ষোড়শ শতাব্দীতে মুঘল সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট আকবর যখন বাংলা শাসন করছিলেন, তখন একটি প্রকট প্রশাসনিক সংকট দেখা দেয়। সেটি হলো খাজনা আদায়ের সময় বনাম ফসল কাটার সময়ের অমিল। তৎকালীন হিজরি সন (চান্দ্র বর্ষ) অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হতো। কিন্তু হিজরি সন প্রতি বছর ১০-১১ দিন করে এগিয়ে আসত। ফলে দেখা যেত, কৃষকের ঘরে ফসল ওঠার আগেই খাজনা আদায়ের পরোয়ানা জারি হতো। এটি ছিল কৃষকের জন্য এক চরম অবিচার।
* ফসলি সনের প্রবর্তন: ১৫৮৪ সালে সম্রাট আকবর জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজিকে নির্দেশ দেন একটি সময়োপযোগী বর্ষপঞ্জি তৈরির জন্য। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে (৯৬৩ হিজরি) আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছরকে ভিত্তি ধরে হিজরি ও সৌর বছরের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রবর্তিত হয় 'তারিখ-এ-এলাহি' বা ফসলি সন, যা আজ আমাদের প্রিয় 'বাংলা সন'।
* অর্থনৈতিক তাৎপর্য: এটি কেবল একটি তারিখ পরিবর্তনের বিষয় ছিল না; এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'এগ্রো-ইকোনমিক রিফর্ম'। আকবর বুঝেছিলেন, কৃষকের আয় নিশ্চিত না হলে সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব সম্ভব নয়। বাংলা সনের মাধ্যমে খাজনা আদায়ের সময়কে নবান্নের সাথে যুক্ত করা হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্বস্তি এনে দেয়।
২. প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান: আধুনিক কৃষি বিপ্লবের চিত্রনাট্য ও ভিত্তিপ্রস্তর
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে যখন তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ আর দুর্ভিক্ষ হানা দিচ্ছিল, তখন জিয়াউর রহমান এক হাতে লাঙল আর অন্য হাতে আধুনিক প্রযুক্তির স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন। তিনি কৃষিকে ড্রয়িংরুমের আলোচনার টেবিল থেকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন কাদা-মাটির প্রান্তরে।
* খাল খনন কর্মসূচি: রাজনীতির নতুন ভাষা: জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে কালজয়ী উদ্যোগ ছিল স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে দেশব্যাপী খাল খনন। তিনি জানতেন, সেচ ব্যবস্থা ছাড়া কৃষি কেবল বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল থাকবে। তিনি হাজার হাজার মাইল খাল খনন করে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করেন। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের বৃহত্তম সামাজিক সংহতি।
* প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন: ১৯৭৭ সালের 'বীজ অধ্যাদেশ' এবং ক্ষুদ্র চাষিদের জন্য জামানতবিহীন কৃষি ঋণের প্রবর্তন ছিল কৃষকের আত্মসম্মান পুনরুদ্ধারের হাতিয়ার। জাপানি প্রযুক্তিতে ইরি-বোরো ধানের চাষ জনপ্রিয় করার মাধ্যমে তিনি 'সবুজ বিপ্লব'-এর প্রকৃত বীজ বপন করেছিলেন।
৩. দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া: কৃষকের মুক্তি ও সচ্ছলতার এক দশক
বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকাল ছিল কৃষকের জন্য এক সোনালি অধ্যায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন বিশ্বব্যাপী মুক্তবাজার অর্থনীতির জোয়ার, তখন তিনি দেশের কৃষককে সুরক্ষাকবচ দিয়েছিলেন।
* ঋণ মওকুফ ও সার নীতির সংস্কার: ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসেই তিনি কৃষকদের ৫০০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করেন, যা ছিল ওই সময়ের কৃষকদের জন্য বিশাল এক আশির্বাদ। সারের বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনি বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করেন, যার ফলে সারের সংকট দূর হয়।
* প্রকৃতি নির্ভরতা থেকে প্রযুক্তিতে রূপান্তর: সেচ যন্ত্রের ওপর আমদানিশুল্ক কমিয়ে তিনি কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে সাধারণ কৃষকের নাগালে নিয়ে আসেন। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়। প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নই ছিল তাঁর 'কৃষক-বান্ধব' রাজনীতির মূল মন্ত্র।
৪. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: স্মার্ট কৃষি ও আগামীর ডিজিটাল বাংলাদেশ
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ কৃষি ও পরিবেশের এক নতুন বিপ্লব প্রত্যক্ষ করছে। তাঁর চিন্তাধারা কেবল উৎপাদন বৃদ্ধিতে নয়, বরং কৃষকের মর্যাদা ও প্রকৃতির সুরক্ষায় নিবদ্ধ।
* কৃষক কার্ড (Farmer's Card): সরাসরি সুবিধা: মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে তারেক রহমান 'কৃষক কার্ড' বা 'ফ্যামিলি কার্ড' প্রবর্তন করেছেন। এর মাধ্যমে সরকারি ভর্তুকি, বীজ এবং সার সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে পৌঁছাচ্ছে। এটি কেবল একটি কার্ড নয়, এটি কৃষকের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সনদ।আজ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে টাঙ্গাইল জেলা থেকে এই কার্ড বিতরণের উদ্বোধন করা হয়।
* খাল ও নদী খনন: প্রকৃতির বিকাশ ও সেচ বিপ্লব: জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির আধুনিক সংস্করণ হিসেবে তারেক রহমান ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। সাহাপাড়া খালের মতো মৃতপ্রায় জলাশয়গুলোকে প্রাণদান করে তিনি কৃষি জমিকে সেচ সুবিধার আওতায় আনছেন।
* পরিবেশগত ভারসাম্য: ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং নদী শাসন প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি কৃষিকে টেকসই (Sustainable) করছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে হলে মাটির ওপরের পানি ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা করতে হবে।
৫. বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্গীকার: মানবিক ও গবেষণাভিত্তিক আগামীর বাংলাদেশ
বিএনপির 'সবার আগে বাংলাদেশ' স্লোগান ও ৫১ দফা ইশতেহার মূলত প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি গবেষণালব্ধ নীল নকশা। তারেক রহমান ঘোষিত এই ইশতেহারে কৃষিকে 'জাতীয় নিরাপত্তার অংশ' হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
* ভবিষ্যৎ রূপকল্প: বিএনপির লক্ষ্য কেবল ফসল উৎপাদন নয়, বরং উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা। প্রতিটি ইউনিয়নে হিমাগার স্থাপন, শস্য বীমা এবং আধুনিক কৃষি বিপণন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
* যৌক্তিক রাজনীতি: বিএনপির রাজনীতি এখন আর কেবল স্লোগান-সর্বস্ব নয়, বরং এটি গবেষণালব্ধ কর্মপরিকল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে। প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষা এবং সামাজিক সাম্য নিশ্চিত করাই হলো এই রাজনীতির মূল স্তম্ভ। তারেক রহমানের নেতৃত্বে 'জীবনমুখী রাজনীতি' আজ তরুণ সমাজের মধ্যে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
পরিশেষে সম্রাট আকবরের আমলের সেই ফসলি সন আজও আমাদের ঋতুচক্র মনে করিয়ে দেয়। প্রেসিডেন্ট জিয়ার কোদাল আর খাল খনন আমাদের শিখিয়েছে স্বাবলম্বী হতে। খালেদা জিয়ার কৃষি সহায়তা আমাদের জুগিয়েছে অন্ন। আর আজ তারেক রহমানের আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশ-বান্ধব নেতৃত্ব আমাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে একটি সমৃদ্ধ, ডিজিটাল ও সবুজ বাংলাদেশের।
রাজনীতি যখন মানুষের পেটের আহার আর হৃদয়ের স্পন্দন বুঝতে পারে, তখনই তা শিল্পে পরিণত হয়। আজ বাংলাদেশের কৃষি-অর্থনীতি সেই শিল্পেরই এক উজ্জ্বল ক্যানভাস। ইতিহাসের শিক্ষা আর আধুনিকতার সংমিশ্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাবে—এটাই আজ বাংলার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক:
ড. আশরাফুর রহমান
অতিরিক্ত আইজিপি
আপনার মতামত লিখুন :