'প্রেসার কুকার' ও ঢালিউডের ত্রিকোণমিতি: অপুর 'না', বুবলীর 'হ্যাঁ'-অতঃপর...

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৭ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম

'হা' অথবা 'না' ছোট্ট দুটো শব্দ কিন্ত বড় সিদ্ধান্ত, বড় গল্প। পাঠকবৃন্দ বলছিলাম বাংলা চলচ্চিত্রের "প্রেসার কুকার" সিনেমা নিয়ে। বাংলা চলচ্চিত্রের জগৎ মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনার উপহার দেয়, যা নিছক বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজ ও মনস্তত্ত্বের গভীরে পৌঁছে যায়। এখানে রম্য আলোচনা, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ঢাকাই সিনেমার কিং শাকিব, তার অতীত স্ত্রী অভিনেত্রী অপু আর বুবলী এই তিন নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রেসার কুকার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সিদ্ধান্তে একটি ছোট সিদ্ধান্ত-“না” এবং “হ্যাঁ”-আজ আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

প্রাসঙ্গিক আলোচনায় যেটা বলছিলাম তা হলো, একটি সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব-একজন ফিরিয়ে দিলেন, অন্যজন গ্রহণ করলেন। কিন্তু এই দুই ভিন্ন প্রতিক্রিয়া যেন এক বৃহত্তর সামাজিক নাটকের ক্ষুদ্র দৃশ্যমাত্র, কিন্ত এর সামাজিক অভিব্যক্তি সুদূর প্রসারি। সমাজ নামক রান্নাঘরে মানুষের সম্পর্কগুলো অনেকটা প্রেশার কুকারের মতোই। বাইরে থেকে শান্ত, চকচকে, নিরীহ-কিন্তু ভেতরে চাপ জমে উঠলেই "সিটি” বাজে। আর সেই সিটির শব্দে কখনো ভাত সিদ্ধ হয়, কখনো সম্পর্ক! এই গল্পে আমরা দুই প্রতীকী চরিত্রকে নিয়ে এগোবো-একজন 'না'-এর প্রতীক, আরেকজন 'হ্যাঁ'-এর প্রতীক।

অপুর 'না', বুবলীর 'হ্যাঁ'-অতঃপর প্রেসার কুকারের সিটি! আমাদের ঢালিউড পাড়াটা অনেকটা বাঙালিয়ানার রান্নাঘরের মতো। সবসময়ই কিছু না কিছু ফুটছে। কখনো ঝোল বেশি, কখনো মশলা কম-আর সেই রান্নার প্রধান শেফ হিসেবে যদি থাকেন স্বয়ং 'কিং খান', তবে তো কথাই নেই। আমাদের সমাজের দুই বিপরীত মনস্তাত্ত্বিক ধারার সংমিশ্রণে রন্ধনশৈলীতে যে অভাবনীয় মোড় দেখা গেল, তাতে খোদ শেফ নিজেও বোধহয় এক গভীর ঘোরের মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছেন।

গল্পটা খুব সহজ, আবার একই সাথে জটিল, মনস্তাত্ত্বিক আবার আবহমানকালের বৈশ্বিক চিত্র। গল্পের দুই নায়িকা- অপু বিশ্বাস ও শবনম বুবলী। দুজনেরই কমন ফ্যাক্টর একজনই, বাংলার কিং খান। তো, প্রস্তাব গেল 'প্রেসার কুকার'-এর চলচ্চিত্রে কিং খানের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করার। অপু 'না' করে দিলেন, আর বুবলী দিলেন 'হ্যাঁ'। ব্যস! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয়ে গেল সেই পুরোনো প্রেসার কুকারের সিটির মতো শব্দ-শাঁই শাঁই!

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বাঙালি নারীর এই 'না' আসলে একটা প্রচ্ছন্ন 'হ্যাঁ' হতেও পারে, আবার হতে পারে চরম বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ। সমাজ এটাকে দেখে 'একগুঁয়েমি' হিসেবে, কিন্তু পর্দার আড়ালে এটা আসলে নিজের আত্মসম্মান পুনরুদ্ধারের শেষ অস্ত্র বলে মনে করে। অন্যদিকে, বুবলীর 'হ্যাঁ' হলো সাহসের ডুগডুগি। তিনি যখন বলেন, "হ্যাঁ, আমি ছিলাম, আছি এবং লড়ছি,” তখন তিনি আসলে সেই সব নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখান যা নারীকে সব সময় 'লুকিয়ে রাখা'র শিক্ষা দেয়। এই 'হ্যাঁ' সমাজের চোখে 'বেপরোয়া', কিন্তু ব্যক্তিগত মুক্তির বিচারে তা এক বিশাল অক্সিজেন সিলিন্ডার।

না ও হ্যাঁ-এর মাঝে যে সূক্ষ্ম জায়গাটা আছে, সেটাই আসল ভালোবাসা, বোঝাপড়া এবং পরিণত সম্পর্কের ভিত্তি।

'না'-আত্মমর্যাদার নীরব উচ্চারণ "না" বলা সবসময় সহজ নয়-বিশেষ করে আমাদের সমাজে, যেখানে নারীদের প্রায়শই শেখানো হয় সমঝোতার ভাষা। তাই যখন কোনো নারী দৃঢ়ভাবে "না" বলেন, সেটি কেবল একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান নয়, বরং এক ধরনের আত্মপ্রকাশ। এই "না" হতে পারে-অতীত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, আত্মসম্মান রক্ষার প্রয়াস, কিংবা নিজের অবস্থান নতুন করে নির্ধারণের ঘোষণা। রম্যভাবে বলতে গেলে, বাঙালি নারীর "না" অনেক সময় সরাসরি অস্বীকৃতি নয়-এটি এক ধরনের সূক্ষ্ম বার্তা: "আমি বদলেছি, হিসাবটাও বদলেছে”। বিষয়টিকে কেবল বাঙালি নারীর অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ রাখা সমীচীন হবে না; বরং এর অন্তরালে এক বিশ্বজনীন নারী-হৃদয়ের আর্তি লুকিয়ে আছে।

অন্যদিকে “হ্যাঁ” বলা মানেই আত্মসমর্পণ নয়; বরং এটি হতে পারে পরিস্থিতি-সচেতন এক বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ। কারণ-সুযোগ গ্রহণ করা কখনো কখনো অগ্রগতির শর্ত, পেশাগত জীবনে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করতেও সিদ্ধান্ত নিতে হয়। হাস্যরসের ছোঁয়ায় বলা যায়, জীবনের মঞ্চে "হ্যাঁ" বলা মানুষরা জানেন-এখানে সব দৃশ্য একবারেই শুট হয়, 'রিটেক' খুব কম!

মনস্তত্ত্বের অন্তর্লোক বিবেচনায় বলা যায়, একই পরিস্থিতিতে ভিন্ন সিদ্ধান্ত-এর পেছনে কাজ করে জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া:

আত্মপরিচয়: "আমি কে, আমি কোথায় দাঁড়িয়ে?”

তুলনামূলক মনোভাব: অন্যের সিদ্ধান্তের বিপরীতে নিজের অবস্থান তৈরি।

প্রতীকী বার্তা: অনেক সময় সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি 'স্টেটমেন্ট'।

রম্য পর্যবেক্ষণে বলা যায়, অনেক সিদ্ধান্ত সিনেমার জন্য নয়, বরং দর্শকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া একটি নিঃশব্দ সংলাপ! সমাজ ও পরিবার এখানে হয় অদৃশ্য পরিচালক। নারীর সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যক্তিগত ইচ্ছার পাশাপাশি থাকে সমাজ ও পরিবারের অদৃশ্য প্রভাব।- পরিবার চায় স্থিতি- সমাজ চায় ব্যাখ্যা- মিডিয়া চায় গল্প। ফলাফলে একই সিদ্ধান্ত ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা পায়-

"না" বললে বলা হয়-আত্মমর্যাদা।

"হ্যাঁ" বললে বলা হয়-কৌশল।

অর্থাৎ, নারীর জীবনে সমালোচনা যেন একটি স্থায়ী ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক!

সংসার বনাম ক্যারিয়ার চিরন্তন সমীকরণ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এই ঘটনাটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে-নারীর জীবনে সংসার ও ক্যারিয়ারের ভারসাম্য।

কেউ ব্যক্তিগত জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন।

কেউ পেশাগত অগ্রগতিকে গুরুত্ব দেন।

কিন্তু মজার বিষয় হলো, দুই পথই চ্যালেঞ্জে ভরা, এবং দু'ক্ষেত্রেই প্রশ্ন থেকে যায়-"আমি কি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি?”

জীবনের দুই সংলাপ শেষ পর্যন্ত “না” এবং “হ্যাঁ”-এই দুই শব্দই জীবনের দুই দিক। কেউ ভুল নয়, কেউ সম্পূর্ণ সঠিকও নয়-কারণ জীবন নিজেই একটি জটিল চিত্রনাট্য। বাঙালি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই সংলাপ- "না, এটা আমি করব না!” এবং "হা, আচ্ছা, দেখা যাক!”- এই দুই বাক্যের মাঝেই লুকিয়ে থাকে-ভালোবাসা, অহং, কৌশল, আত্মসম্মান এবং সামাজিক নাটকের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ।

শেষ কথা হলো অপুর "না" এবং বুবলীর "হ্যাঁ”-এটি কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়; বরং এটি আমাদের সমাজের এক প্রতিফলন। প্রতিটি নারীর সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে তার নিজস্ব বাস্তবতা, অভিজ্ঞতা এবং সময়ের দাবি।

 

-লেখক

ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

অতিরিক্ত আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ

Link copied!