ড. মো. আশরাফুর রহমান: বাঙালি জনজীবনে 'নববর্ষ' কেবল একটি তারিখ পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি গভীর আবেগ, ইতিহাস এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার ফসল । বর্তমানে নববর্ষ উদযাপন নিয়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির যে সংঘাত চোখে পড়ে, তার মূলে রয়েছে ইতিহাসের পাঠভেদ এবং উৎসবের বিবর্তিত রূপ । এই প্রবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব কীভাবে কৃষি ও রাজস্বের প্রয়োজনে জন্ম নেওয়া এই দিনটি কালক্রমে বাঙালির জাতীয় সত্তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে, এবং ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উৎসবের মূল্যায়ন কোথায় দাঁড়ায় ।
ইসলাম, দেশীয় সংস্কৃতি ও নববর্ষ: একটি তুলনামূলক আলোচনা
ইসলাম একটি বৈশ্বিক জীবনব্যবস্থা, যার নিজস্ব ক্যালেন্ডার (হিজরি) এবং উৎসব (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা) রয়েছে । অন্যদিকে, বাংলা নববর্ষ একটি আঞ্চলিক ও ভাষাভিত্তিক লোকউৎসব । এই দুটির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে হলে আমাদের 'বিশ্বাস' ও 'সংস্কৃতি'র পার্থক্য বুঝতে হবে ।
ক) উৎসবের উৎস ও ভিত্তি
ইসলামী উৎসবগুলো মূলত ইবাদতকেন্দ্রিক এবং স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম । হিজরি সাল গণনা শুরু হয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে । ইসলামে 'ঈদ' শব্দটি দ্বারা নির্দিষ্ট দুটি আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় উৎসবকে বোঝায়, যা উদযাপনের পদ্ধতিও সুন্নাহ কর্তৃক নির্ধারিত । বাংলা নববর্ষের মূল ভিত্তি হলো কৃষি ও অর্থনীতি । এর সাথে কোনো একক ধর্মের সরাসরি যোগসূত্র ছিল না, বরং এটি ছিল একটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার । এই উৎসবের উৎস সন্ধানে গেলে আমরা দেখতে পাই যে, মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হতো, যা ফসলি মৌসুমের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না
খ) পার্থক্য ও মেলবন্ধন
পার্থক্যটি মূলত উদযাপনের রীতিতে । ইসলামে 'হারাম' বা নিষিদ্ধ কোনো কাজ (যেমন: শিরক, অশ্লীলতা বা বেহায়াপনা) সংস্কৃতির নামে গ্রহণ করা অনুমোদিত নয় । তবে বাঙালি সংস্কৃতির অনেক উপাদান যেমন নতুন পোশাক পরা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করা, বা ব্যবসায়িক লেনদেন পরিষ্কার করা (হালখাতা)-ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক নয় ।
নববর্ষ ও ইসলামি নৈতিকতা: দ্বন্দ্ব না কি ভুল বোঝাবুঝি?
অনেকের ধারণা, বাংলা নববর্ষ পালন করা মানেই ইসলামের নৈতিকতাবিরোধী কাজ । এই বিতর্কের প্রধান কারণ উৎসবের বর্তমান 'প্রকাশভঙ্গি' এবং উৎসবের সাথে জড়িয়ে যাওয়া কিছু বিতর্কিত উপাচার ।
নৈতিক চর্চার সংঘাত কোথায়?
সাম্প্রতিক সময়ে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে । ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে এই শোভাযাত্রার সূচনা হয় । তখনকার সেই শোভাযাত্রার একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল-স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে । চিত্রশিল্পীরা এই মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিকল্পনা করেন এবং তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করার বিপরীতে সব ধর্মের মানুষের জন্য বাঙালি সংস্কৃতি তুলে ধরার চেষ্টা ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে । বিতর্কের মূল কারণ পশুপাখির মুখোশ, ছবি ও প্রতিমা বহন করা নিয়ে ।
অনেকে দাবি করেন, হিন্দুধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী এসব পশু-পাখি বিভিন্ন দেবদেবীর বাহন ছিল, যা ইসলামের 'তাওহিদ' বা একত্ববাদের পরিপন্থী । যেমন পেঁচাকে হিন্দুদের মতে মঙ্গলের প্রতীক এবং দেবী লক্ষীর বাহন, ইঁদুর গণেশ দেবতার বাহন, হংস সরস্বতীর বাহন, এবং হাতি, বাঘ ও সিংহ দেবী দুর্গার বাহন হিসেবে পরিচিত । এছাড়াও মঙ্গল শোভাযাত্রায় সূর্যের মুখোশ দেখা যায়, যাকে হিন্দুরা সূর্য দেবতা হিসেবে পূজা করে ।
ইসলামে কল্যাণ বা অকল্যাণের মালিক একমাত্র আল্লাহ, এবং এই ধরণের প্রতীকী কর্মকাণ্ডকে অনেক আলেম ইসলামী বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন ।
ইসলামের দৃষ্টিতে উৎসবের প্রকৃতি
ইসলাম ধর্মে নবী মুহাম্মাদ (সা.) পরিষ্কারভাবে মুসলিমদের উৎসবকে নির্ধারণ করেছেন, ফলে অন্যদের উৎসব মুসলিমদের সংস্কৃতিতে প্রবেশের সুযোগ নেই । রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।" (বুখারী, মুসলিম) । বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ সম্পর্কে বলেন: "উৎসব-অনুষ্ঠান ধর্মীয় বিধান..." ।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-বাংলা নববর্ষ কি 'অন্য ধর্মের' উৎসব নাকি একটি আঞ্চলিক কৃষি-উৎসব? যেহেতু এর শেকড় কৃষি ও অর্থনীতিতে, তাই এটিকে সরাসরি অন্য ধর্মের উৎসব বলে চিহ্নিত করা যায় না । মূল সমস্যা হলো সমসাময়িক উদযাপনের ধরন, যাতে কিছু হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক ও আচার অনুপ্রবেশ ঘটেছে ।
নৈতিক সংহতি ও সমন্বয়
ইসলাম ও বাংলা সংস্কৃতি উভয়েই পারিবারিক বন্ধন, প্রতিবেশীর হক এবং স্বচ্ছতা-হালখাতার মাধ্যমে দেনা-পানা মেটানো-কে গুরুত্ব দেয় ।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলার মুসলিম কৃষকরা নববর্ষকে বরণ করতেন দোয়া ও মিলাদের মাধ্যমে, যা ছিল সংস্কৃতির সাথে ধর্মের একটি সুন্দর সমন্বয় । এই সত্য আমাদের সামনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথের ইঙ্গিত দেয় ।
সম্রাট আকবর, কৃষি ও রাজস্ব: উৎসবের বিবর্তন
বাংলা সনের জন্ম কোনো ধর্মীয় উৎসব পালনের জন্য হয়নি, বরং এটি ছিল অত্যন্ত প্র্যাকটিক্যাল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৫৫৬ সালে সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের পর বাংলার খাজনা আদায়ে জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় । সমস্যাটি ছিল হিজরি পঞ্জিকার সাথে সম্পর্কিত । হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না, এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হত । হিজরি চান্দ্রসনের ব্যাপ্তি ৩৫৪ দিন, অথচ সৌরবর্ষ ৩৬৫ দিনের । এই ১১ দিনের পার্থক্যের কারণে প্রতি তিন বছরে হিজরি সন সৌর সনের চেয়ে এক মাস এগিয়ে আসত । ফলশ্রুতিতে ফসল ওঠার মৌসুম আসার আগেই খাজনা আদায়ের সময় চলে আসত, যা কৃষকদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল ।
বাংলা সনের সূচনা
এই সমস্যা সমাধানে সম্রাট আকবর তার দরবারের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে একটি নতুন ক্যালেন্ডার তৈরির নির্দেশ দেন । ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন । ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০-১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়, তবে কার্যকারিতা দেখানো হয় ১৫৫৬ সালের ১১ মার্চ অর্থাৎ সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে । প্রথমে এই সনের নাম ছিল 'ফসলি সন', পরে 'বঙ্গাব্দ' বা 'বাংলা বর্ষ' নামে পরিচিতি পায় । আকবর ১৫৮৫ সাল থেকে সুবে বাংলায় পুরোপুরি বঙ্গাব্দ চালু করেন । হিজরি ৯৬৩ সালকে ভিত্তি ধরে সৌরবর্ষের হিসাবে নতুন গণনা শুরু হয়, যা কৃষি ও ফসলের মৌসুমের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল ।
হালখাতা ও কৃষি সংস্কৃতি
বাংলা নববর্ষের সাথে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক বিদ্যমান । 'কৃষ্টি' শব্দের অর্থ কর্ষণ, লাঙল চালনা, কৃষিকর্ম বা সংস্কৃতি । এ থেকেই বোঝা যায়, এ অঞ্চলের সংস্কৃতি মূলত কৃষিনির্ভর । বাংলা নববর্ষ হলো নতুন এক ফসল চক্রের শুরু । হালখাতা ছিল নববর্ষের আদি রূপ-বৈশাখের প্রথম দিনে প্রজারা খাজনা পরিশোধ করত এবং জমিদাররা মিষ্টি মুখ করাতেন । ব্যবসায়ীরা পুরনো খাতা বন্ধ করে নতুন খাতা খুলতেন। কৃষি ও ফসলের মঙ্গলকে সামনে রেখে বাংলা সন প্রবর্তনের সবচেয়ে বেশি সম্পর্ক বিদ্যমান, তাই বাংলা সনের আরেক নাম 'ফসলি সাল' ।
উৎসবের রূপান্তর
যা ছিল স্রেফ একটি কর আদায়ের দিন, তা কীভাবে উৎসবে পরিণত হলো? খাজনা দিতে আসা কৃষকদের কেন্দ্র করে মেলা বসত, যেখানে কৃষি সরঞ্জাম ও মাটির তৈজসপত্র কেনাবেচা হতো । ধীরে ধীরে এটি একটি সামাজিক মেলায় রূপ নেয় ।
আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে । কিন্তু প্রকৃত রূপান্তর ঘটে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে, যখন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে । বাংলা নববর্ষ পাকিস্তানি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয় । ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়, যা একে একটি নাগরিক উৎসবে রূপ দেয় ।
মঙ্গল শোভাযাত্রা: নতুন সংযোজন
মঙ্গল শোভাযাত্রা নববর্ষ উদযাপনের অপেক্ষাকৃত নতুন একটি সংযোজন । ১৯৮৯ সালে শিক্ষার্থীদের আয়োজনে প্রথম ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্র শুরু হয় ।
এর মূল উদ্দেশ্য ছিল অসাম্প্রদায়িকতা ও সাংস্কৃতিক ঐক্য প্রকাশ করা । ২০১৬ সালে এটি ইউনেস্কোর অপরিমেয় বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় ।
সমন্বয় ও ভারসাম্য
বাংলা নববর্ষের শেকড় মূলত কৃষকের লাঙল আর মাটির ঘ্রাণে । এটি কোনো বিশেষ ধর্মের জয়গান গাইতে আসেনি, বরং এসেছিল করের বোঝা হালকা করতে এবং বাংলার অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে ।
ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয়েও একজন বাঙালি তার কৃষিজ ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পারেন, যতক্ষণ না তা ধর্মের মৌলিক বিশ্বাসে আঘাত করে । সমস্যা মূলত উৎসবের বর্তমান প্রকাশভঙ্গিটিতে, বিশেষ করে মঙ্গল শোভাযাত্রার সাথে জড়িয়ে যাওয়া প্রতীকী উপাচারগুলোতে, যা অনেকের কাছে হিন্দু ধর্মীয় অনুশীলনের স্মারক হিসেবে বিবেচিত ।
বর্তমান যুগে উৎসবের মধ্যে অপসংস্কৃতি বর্জন করে যদি আমরা এর ঐতিহাসিক সত্যতা (কৃষি ও অর্থনীতি) এবং মানবিক মূল্যবোধকে তুলে ধরি, তবেই এটি একটি সর্বজনীন ও বিতর্কমুক্ত উৎসবে পরিণত হবে । ইসলামের দৃষ্টিতে একটি উৎসব গ্রহণযোগ্য হবে কিনা, তা নির্ভর করে তার বিষয়বস্তুর উপর-সেখানে শিরক বা হারাম কাজ আছে কিনা । আর সেজন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও সঠিক ইতিহাসচর্চা ।
যেহেতু বাঙালি জাতির একটি বড় অংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী, তাই ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান জানিয়ে এবং সঠিক ইতিহাস তুলে ধরে নববর্ষ উদযাপনের ধরনকে আরও পরিমার্জিত ও সর্বজনীন করা জরুরি । ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বাংলা নববর্ষের আদি রূপ ছিল অত্যন্ত প্র্যাকটিক্যাল এবং কৃষি-কেন্দ্রিক-এমন একটি সত্য যা উপেক্ষা করে এই উৎসবের কোনো মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে ।
(লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক, অতিরিক্ত আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ।)
আপনার মতামত লিখুন :