জীর্ণ পুরাতনকে পেছনে ফেলে নতুনের আহবানে জেগে উঠেছে বাঙালি। ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হয় ঐতিহ্যবাহী ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানাতে এই বর্ণিল আয়োজনে অংশ নেন নানা বয়স ও শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ।
সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রায় ছিল রঙিন মুখোশ, লোকজ মোটিফ ও বাংলার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ। বিশালাকার হাতি, ঘোড়া, বাঘ, পাখি ও বেহালার প্রতিকৃতিতে সেজেছিল পুরো এলাকা। চারুকলা থেকে শুরু হয়ে শোভাযাত্রাটি শাহবাগ হয়ে পুনরায় টিএসসি ও রাজু ভাস্কর্য প্রদক্ষিণ করে। অংশগ্রহণকারীদের ঢল ও ‘এসো হে বৈশাখ’ গানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ঢাবি ক্যাম্পাস।
শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষের কণ্ঠে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রত্যাশা ফুটে ওঠে। অনেকে সাম্প্রতিক বাউল শিল্পীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। অংশগ্রহণকারীদের মতে, এই উৎসব কেবল বর্ষবরণ নয়, বরং এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও শেকড়ে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য আবেগঘন উপলক্ষ।
শোভাযাত্রার আগে ভোরে রমনা বটমূলে অনুষ্ঠিত হয় ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী প্রভাতী আয়োজন। সম্মিলিত কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গান ও ধ্রুপদী সুরের মূর্ছনায় স্বাগত জানানো হয় নতুন বছরকে। প্রায় দুই ঘণ্টার এই আয়োজনে মোট ২২টি গান ও কবিতা পরিবেশিত হয়, যা রাজধানীতে এক স্নিগ্ধ আমেজ তৈরি করে।
পহেলা বৈশাখের এই বিশাল জমায়েত ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ও আশেপাশের এলাকায় নেওয়া হয়েছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত ছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে মাস্ক পরা ও ব্যাগ বহনে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও উৎসবের আমেজে তার কোনো ভাটা পড়েনি।
বাঙালির এই প্রাণের উৎসবে রাজধানীসহ সারাদেশে এখন বইছে আনন্দের জোয়ার। জরাজীর্ণ সব গ্লানি মুছে একটি সমৃদ্ধ ও সম্প্রীতির বছরের প্রত্যাশা সবার মনে।
আপনার মতামত লিখুন :