বাংলা নববর্ষ: আশার, সম্ভাবনার এবং নবজাগরণের

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ০২:৪৮ পিএম

বাঙালি জীবনের অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন এক উজ্জ্বল উৎসব পহেলা বৈশাখ—বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ। এই দিনটি বাঙালির প্রাণে নিয়ে আসে এক অনির্বচনীয় উৎসব-আমেজ, এক স্বচ্ছ, ফুরফুরে হাওয়া। আলপনা আঁকা শাড়ি, পাঞ্জাবি, লাল-সাদা-সবুজের রঙিন আবেশ—সব মিলিয়ে দিনটি যেন এক চলমান চিত্রকল্প।

গালভরা ফুলকি, হাতে রঙিন নকশা-আধুনিকতার স্পর্শে এই ঐতিহ্য এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্যাটেলাইট টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচার থেকে শুরু করে রাজধানীর রমনার বটমূল, বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম—সবখানেই নববর্ষের উৎসব ছড়িয়ে পড়ে। শহরের অলিগলিতে বসে বৈশাখী মেলা; পান্তা-ইলিশ, ঢাক-ঢোল, বাঁশির সুর আর মঙ্গল শোভাযাত্রায় পূর্ণতা পায় এই মহোৎসব।

বাংলা নববর্ষের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, সৌর পঞ্জি অনুসারে বাংলায় বারো মাসের ধারণা বহু প্রাচীন। তবে গ্রেগরীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এই সৌরবর্ষ গণনা শুরু হতো। মোগল আমলে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করা হতো হিজরি সনের ভিত্তিতে, যা চন্দ্রনির্ভর হওয়ায় কৃষি মৌসুমের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। এই অসামঞ্জস্য দূর করতে সম্রাট আকবর বাংলা সনের সংস্কারের উদ্যোগ নেন।

তাঁর নির্দেশে জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌরবর্ষ ও হিজরি সনের সমন্বয়ে নতুন বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এর আনুষ্ঠানিক সূচনা হলেও কার্যকারিতা ধরা হয় ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর থেকে—সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের দিন থেকে। প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত হলেও পরে এটি ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা সন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

বাংলা মাসগুলোর নামও এসেছে নক্ষত্রম্ললের নাম থেকে—বিশাখা থেকে বৈশাখ, জ্যেষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, অগ্রইহনী থেকে অগ্রহায়ণ, পূষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফল্গুনি থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা থেকে চৈত্র। একসময় অগ্রহায়ণ মাসেই ধান কাটার সূচনা হতো বলে এটিকেই বছরের প্রথম মাস ধরা হতো। পরবর্তীকালে সম্রাট শাহজাহান সপ্তাহভিত্তিক দিনের নামকরণ প্রবর্তন করেন-রবিবার থেকে শনিবার—যা ইংরেজি দিনের নামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি সামাজিক রীতি হলো ‘হালখাতা’। চৈত্র মাসের শেষ দিনে কৃষকরা জমির খাজনা পরিশোধ করতেন, আর পহেলা বৈশাখে জমিদাররা তাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। পরবর্তীকালে এই প্রথা ব্যবসায়িক পরিম্নলে ছড়িয়ে পড়ে। দোকানিরা পুরোনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খুলতেন, গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করিয়ে নতুন বছরের বাণিজ্য শুরু করতেন। আজও গ্রামগঞ্জের বাজার-বন্দরে এই হালখাতার ঐতিহ্য দেখা যায়।

শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি-মানবসভ্যতার বিকাশের প্রধান অনুষঙ্গ। বাঙালির সভ্যতা পেশিশক্তির নয়, জ্ঞানশক্তির আলোয় বিকশিত হয়েছে—যার নির্দিষ্ট কাল নির্ধারণ কঠিন। এই সভ্যতা সমবেত মানুষের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ফসল। যদিও এর বহু প্রত্ননিদর্শন আজ অনুপস্থিত, তবুও এর সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য আকাশের মতোই বিস্তৃত। দুঃখের বিষয়, এই ঐশ্বর্যের অল্প অংশও আমরা আজ ধরে রাখতে পারিনি। ফলে আমাদের সমাজ তার পূর্বের দীপ্তি অনেকটাই হারিয়েছে।

তবু উৎসব আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়, নতুন কিছু গড়তে উদ্বুদ্ধ করে। বাংলা নববর্ষ সেই অর্থে এক নবজাগরণের প্রতীক। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা এই দেশ-ফুলে-ফলে, শস্য-শ্যামলে, রূপে-রসে সমৃদ্ধ-ছয় ঋতুর আবর্তনে এক অনন্য লীলাক্ষেত্র। এই সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়েই বাঙালি উৎসবে মেতে ওঠে। ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’—এই প্রবাদ যেন তারই প্রমাণ। নববর্ষের দিনে প্রকৃতি যেমন নতুন সাজে সেজে ওঠে, তেমনি মানুষও নতুন পোশাকে, নতুন স্বপ্নে নিজেকে সাজায়। চৈত্রসংক্রান্তির মাধ্যমে পুরোনো বছরের অবসান ঘটে, আর পহেলা বৈশাখে শুরু হয় নতুনের যাত্রা।

এই সন্ধিক্ষণে মানুষ অতীতের দুঃখ-বেদনা ঝেড়ে ফেলে নতুন আশায় বুক বাঁধে। গ্রামবাংলার মেলাগুলোতে দেখা যায় মানুষের সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ—মাটির পুতুল, তালপাতার পাখা, বাঁশের বাঁশি, পাটের তৈরি সামগ্রী—সব মিলিয়ে যেন জীবনের এক সরল অথচ গভীর শিল্পরূপ। দারিদ্র্য সত্ত্বেও এই মানুষগুলো আনন্দ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে না।

কিন্তু বর্তমান সময়ে একটি আক্ষেপ থেকেই যায়—উৎসব আছে, কিন্তু সেই প্রাণস্পন্দন অনেকাংশে ম্লান। একসময় সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ একসঙ্গে এই দিনে মেতে উঠতেন; আজ সেখানে বিভাজনের ছায়া স্পষ্ট। অথচ পহেলা বৈশাখ তো মহামিলনের উৎসব-যেখানে মানুষের পরিচয় শুধু ‘বাঙালি’। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ, শামসুর রাহমান—তাঁদের গান ও কবিতায় এই দিনের আহ্বান ছিল অশুভকে দূরে সরিয়ে শুভের পথে এগিয়ে যাওয়ার। 

নববর্ষ তাই শুধু একটি দিন নয়; এটি এক প্রতীক—আশার, সম্ভাবনার, নবজাগরণের। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন এক নিরন্তর নবায়নের যাত্রা। পুরোনোকে বিদায় জানিয়ে নতুনকে বরণ করার মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য। তাই প্রার্থনা একটাই—আমাদের অন্তর যেন পরিশুদ্ধ হয়, উজ্জ্বল হয়, সুন্দর হয়ে ওঠে; যেন আমরা আবার ফিরে পাই সেই প্রাণময় উৎসবের সত্তা, যেখানে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়, মিলনের সুরে বেজে ওঠে এক অভিন্ন হৃদস্পন্দন।

Link copied!