প্রশাসনের বিভিন্ন কাজে নিজস্বার্থ রক্ষায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন জিয়া পরিষদ ও ইউট্যাবের শিক্ষকদের মাঝে গ্রুপিং তৈরি করার অভিযোগ উঠেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ইবিতে বিএনপিপন্থী শিক্ষক বলতে শুরুতেই যাদের নাম আসে তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে 'মাইনাস' করে পছন্দসই শিক্ষকদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে জিয়া পরিষদে বিভক্তির পথ তৈরি করেছেন তিনি।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের শিক্ষক অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ। দায়িত্ব পাওয়ার পর কিছুদিন জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সাথে সমন্বয় রেখে প্রশাসন পরিচালনা শুরু করলেও ক্রমেই তিনি জামায়াতপন্থীদের প্রতি ঝুঁকে পড়েন বলে অভিযোগ বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের।
এছাড়া, দায়িত্ব গ্রহণের পরেই শূন্য থাকা প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা, প্রভোস্ট, সহকারী প্রক্টর ও পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারসহ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেন তিনি। এসব পদে পদায়নের ক্ষেত্রে অজানা কারণে ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
তন্মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হিসেবে নিয়োগ পান ড. শাহীনুজ্জামান, সহকারী প্রক্টর ড. খাইরুল ইসলাম, খালেদা জিয়া হলের প্রভোস্ট ড. জালাল উদ্দীন, আইসিটি সেলের পরিচালক ড. শাহজাহান আলী অন্যতম। এছাড়া, বেশ কিছুদিন পর পছন্দের ব্যক্তিকে রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ কেন্দ্র করে ভিসি অফিসে ন্যাক্কারজনক হট্টগোলের পর ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পান ইইই বিভাগের ড. মনজুরুল হক। গেল বছরের শেষ দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান সেই ইইই বিভাগের ই ড. নজিবুল হক। আবার প্রভোস্ট কোটায় সিন্ডিকেটের সদস্য পদ পান প্রভোস্ট ড. জালাল উদ্দীনও। এরা সবাই নিজেদের বিএনপিপন্থী শিক্ষক হিসেবেই পরিচয় দিয়ে থাকেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের বিভিন্ন পদে পছন্দসই ব্যক্তিদের পদায়নের পরেই ধীরে ধীরে নিজস্ব বলয় নিয়ে চলতে শুরু করেন ইবি উপাচার্য। এসময় জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন গ্রীণ ফোরামের নেতৃবৃন্দ ভিসির চারপাশে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পায়। এছাড়া, ধীরে ধীরে ইইই বিভাগের শিক্ষকদের নেতৃত্বে প্রশাসনের পেছনে একটি ‘নিজস্ব গ্রুপ’ গড়ে ওঠে, যারা ভিসির যৌক্তিক-অযৌক্তিক সব সিদ্ধান্তে সমর্থন দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত, নিপীড়িত বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করতে ভূমিকা রাখে। এছাড়াও, প্রশাসনের যৌক্তিক-অযৌক্তিক যেকোন ইচ্ছা বাস্তবায়নে এসব শিক্ষকরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন বলে জানা গেছে। তার সর্বশেষ প্রমাণ পাওয়া যায়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার পর অনুষ্ঠিত শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের ঘোষণা দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একাধিক নিয়োগ বোর্ডে ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ তোলে শাখা ছাত্রদল। এছাড়া গত ১৩ জানুয়ারি ইউট্যাবের আয়োজিত এক সভার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি, শৃঙ্খলা রক্ষার্থে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে আর কোনো নতুন নিয়োগ নির্বাচনী বোর্ড না করার জন্য ভিসিকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানায় ইউট্যাবের নেতৃবৃন্দ। তবে ভিসির ইচ্ছা বাস্তবায়নে নির্বাচনের আগে নিয়োগ না দিতে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ড. নজিবুল হক, প্রক্টর ড. শাহীনুজ্জামান ও সহকারী প্রক্টর ড. খাইরুল ইসলাম। এ নিয়ে সভায় হট্টগোলও হয়।
পাশাপাশি, ফ্যাসিস্টবিরোধী শিক্ষকদের সাথে আলোচনা না করেই আগামী ৩ বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬টি বিভাগে শিক্ষক পদোন্নতি (নিয়োগসহ) বোর্ড তথা হায়ার বোর্ডের জন্য সদস্য ও বিশেষজ্ঞ সদস্য তালিকা প্রস্তুত করেন ইবি উপাচার্য যেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮০ শিক্ষককে মনোনীত করা হয়। এই হায়ার বোর্ডেও বৃহৎ সংখ্যক আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের স্থান দেন তিনি। এ নিয়ে গত অক্টোবরে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে, বিষয়টি জুলাইয়ের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা। তখন থেকেই তারা অভিযোগ করতে থাকেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের 'সাইড' করে জামায়াতপন্থী ও নিজস্ব সুবিধাভোগী বিএনপির পরিচয়ধারী কয়েকজন শিক্ষককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রশাসন পরিচালনা করছেন।
একইধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে প্রশাসনের একটি অংশ থেকেও। দীর্ঘদিন খালি থাকার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি হিসেবে নিয়োগ পান বিএনপিপন্থী শিক্ষক ড. এয়াকুব আলী। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই প্রশাসনের ভেতরে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ আসতে থাকে। গতবছরের মার্চে রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ কে কেন্দ্র করে ভিসি অফিসে সৃষ্ট হট্টগোলে প্রোভিসির সাথে বাকবিতন্ডায় জড়ান প্রক্টর ড. শাহীনুজ্জামান। এসময় প্রোভিসি ড. এম এয়াকুব আলী প্রক্টর ড. শাহীনুজ্জামানকে ‘জামায়াত’ আখ্যা দিলে বাকবিতন্ডা শুরু হয়। এসময় প্রোভিসির সাথে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করেন প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর ড. ফকরুল ইসলাম এবং ভিসি ড. নকীব নসরুল্লাহ। এরপর থেকেই প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রোভিসি কিছু জানেন না বলে জানাতেন সাংবাদিকদের।
প্রশাসনের এই সমন্বয়হীনতার কারণ হিসেবে তিনি বলতেন, তাকে কিছু জানানো হয় না। কিছু কিছু সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি ফেসবুক থেকে জানতে পারেন, বাদবাকি অনেক সিদ্ধান্ত তাকে অবগত না করেই গ্রহণ করা হয়। গতবছরের অক্টোবরে ভিসির রুটিন দায়িত্ব পালনকালে শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা প্রো-ভিসিকে দাবি আদায়ে চাপ দিলে তিনি তৎক্ষনাৎ ভিসিকে হোয়াটস অ্যাপে ফোন করে করণীয় জানতে চান এবং সেদিন প্রকাশ্যেই তিনি গৃহীত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাকে অন্ধকারে রাখার অভিযোগ করেন। ভিসি ড. নকীব নসরুল্লাহও ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরে প্রোভিসির সাথে বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানান। এছাড়াও, গত দেড় বছরে বিভিন্ন সময় সবচেয়ে বেশি বার প্রশাসন ভবনে তালা মেরে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটেছে প্রোভিসি এম এয়াকুব আলীর সাথে।
এসবের ধারাবাহিকতায়, গতবছরের ৭ ডিসেম্বর বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করায় ও প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নীরব প্রতিবাদ হিসেবে বিভিন্ন কমিটির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের শীর্ষস্থানীয় তিন শিক্ষক নেতা। তারা হচ্ছেন - জিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় মহাসচিব অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন, সাদা দলের আহবায়ক এবং ইউট্যাবের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান এবং ইবি ইউট্যাবের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ইউট্যাবের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. তোজাম্মেল হোসেন। প্রশাসনের কাছে বিভিন্ন আবেদন ও পরামর্শ দেওয়া হলেও তা আমলে না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় জিয়া পরিষদেরও।
এ বিষয়ে ইবির জিয়া পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. ফারুকুজ্জামান খান বলেন, ডেফিনিটলি ভাইস চ্যান্সেলর তার নিজের সুবিধার্থে এই বিভক্তি তৈরির কাজ করেছেন। প্রতি প্রশাসনেই ভিসি কেন্দ্রিক কিছু শিক্ষক থাকে যারা ভিসির আশপাশে থেকে কিছু সুবিধা নিতে চায়। আবার ভিসিও তার কর্মকাণ্ডের সুবিধার্থে কয়েকজন শিক্ষককে কাছে রাখেন। তারাই দলের ভিতরে বিভিন্ন সমস্যা তৈরি করে, প্রভাব তৈরি করে। এসব থেকেই বিভক্তির সূত্রপাত হয়। আমাদের ক্ষেত্রেই শুধু না, বিগত প্রশাসনেও এমন ছিলো। জিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় মহাসচিব এখানে আছেন, তিনি সব বিষয়েই অবগত। এখন আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছি।
বিভক্তির ব্যাপারে ইবি ইউট্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ড. তোজাম্মেল হোসেন বলেন, যোগদানের পর থেকেই উনি বিশেষ একটি দলের হয়ে কাজ করেছেন। ডিভাইড এন্ড রুল নীতির প্রয়োগ ঘটিয়ে নিজের কাজ করিয়ে নিয়েছেন। এটিকে যারা সমর্থন করেনি তাদের উনি এড়িয়ে চলেছেন, যারা বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের 'সাইড' করা হয়েছে।
উনার এ ধরনের আচরণের কারণ জানতে চাইলে এড়িয়ে গিয়েছেন, কখনো যেসব উত্তর দিয়েছেন তা সন্তোষজনক নয়। এতে সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, জিয়া পরিষদের অধিকাংশ সদস্য তাদের ভালো চোখে দেখছেন না। আমরা এর অবসান চাই।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে ইবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহকে মুঠোফোনে চেষ্টা করা হলে তিনি একটি অনলাইন মিটিংয়ে আছেন, পরে কথা বলবেন বলে জানান। পরবর্তী দিন তার কার্যালয়ে কয়েকঘন্টা অপেক্ষা করলেও তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। তিনি নিজেই পরবর্তীতে প্রতিবেদকের সাথে যোগাযোগ করবেন বলে জানান তার ব্যক্তিগত সচিব গোলাম মাহফুজ মঞ্জু। কিন্তু তাতেও সাড়া না পাওয়ায় আজ আবারো তার মুঠোফোনে চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
আপনার মতামত লিখুন :