গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার এক নিঃশব্দ গ্রামে জন্ম নিয়েছে এক হৃদয়বিদারক মানবিক কাহিনি। স্বামী হারানোর শোক, মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকার অনিশ্চয়তা এবং দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে দিশেহারা এক মা এই নির্মম বাস্তবতায় স্বামীর কবরের পাশেই আশ্রয় নিয়েছিলেন সোনিয়া বেগম।
শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তার ভাগ্যে জোটে কিছুটা স্বস্তির আশ্বাস।উপজেলার মধ্যপাড়া ইউনিয়নের উত্তর লস্করচালা গ্রামের বাসিন্দা সুজন মাহমুদ (৩৮) দীর্ঘ চার বছর ব্রেন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে গত ২ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী সোনিয়া বেগম দুই সন্তান ৯ বছর বয়সী মেয়ে ছোঁয়া এবং ১৮ মাস বয়সী এক শিশুপুত্রকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে যান।পারিবারিক বিরোধের জেরে শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই না পেয়ে একপর্যায়ে স্বামীর কবরের পাশেই বসে দিন কাটাতে শুরু করেন তিনি। বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট ছোঁয়ার কান্নাভেজা কণ্ঠ“বাবা, তুমি কোথায় গেলে? আমরা কোথায় থাকব?”এ দৃশ্য এলাকাবাসীর হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভালোবেসে বিয়ে করার পর থেকেই সুজন মাহমুদ ও তার স্ত্রীকে পরিবার পুরোপুরি মেনে নেয়নি। ফলে তারা আলাদা বসবাস করতেন। পরবর্তীতে সোনিয়ার মায়ের সহায়তায় ৩ শতাংশ জমি কিনে একটি ছোট ঘর নির্মাণ করে সেখানে বসবাস শুরু করেন তারা। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর সেই নিরাপত্তাও ভেঙে পড়ে।সোনিয়া বেগমের অভিযোগ, তার শ্বশুর কফিল উদ্দিনের নামে প্রায় ৫২ শতাংশ জমি থাকলেও তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি। বরং বসবাস নিয়ে তৈরি হয় টানাপোড়েন। তবে শ্বশুরের দাবি, তিনি জীবিত অবস্থায় জমি হস্তান্তর করতে রাজি নন; মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রেই সবাই তাদের অংশ বুঝে নেবেন। বর্তমানে সোনিয়া ও তার সন্তানরা চাচাতো দেবর সাইফুল ইসলামের বাড়িতে আশ্রিত। মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সাইফুলের পরিবার তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। একই সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের পর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এগিয়ে এসে আর্থিক সহায়তা ও খাদ্যসামগ্রী প্রদান করছেন।
ঘটনাটি গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেলে প্রশাসনের নজরে আসে। কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলেন এবং সমাধানের উদ্যোগ নেন। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাও সোনিয়াকে বিধবা ভাতা ও পুনর্বাসন সুবিধার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন।
কালিয়াকৈর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. শহিদুল ইসলাম পিপিএম জানান, উভয় পক্ষ লিখিত অভিযোগ দিয়েছে এবং বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলছে। প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
পরবর্তীতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে উভয় পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছায়। মধ্যপাড়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আছান উদ্দিন জানান, সুজন মাহমুদের স্ত্রী ও দুই সন্তানের নামে ৬ শতাংশ জমি লিখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং দ্রুত তা বাস্তবায়ন করা হবে।
এলাকাবাসীর মতে, দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ ভুলে অন্তত দুইটি নিষ্পাপ শিশুর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় এই সমঝোতা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এখন সবার প্রত্যাশা প্রতিশ্রুত জমি দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়া হবে এবং সোনিয়া বেগম ও তার সন্তানদের জীবনে ফিরবে স্থিতি ও নিরাপত্তা।
আপনার মতামত লিখুন :