পার্বত্য জেলা বান্দরবানে হাজার হাজার একর মাছ চাষের উপযোগী জমি ও জলাশয় অব্যবহৃত পড়ে থাকায় সম্ভাবনাময় মৎস্য খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পাচ্ছে না। সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অর্থসংকট, পুকুর নির্মাণ ও সংস্কারের উচ্চ ব্যয় এবং সরকারি সহায়তা প্রাপ্তির ধীরগতির কারণে আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অনেক চাষি মাছ চাষে এগোতে পারছেন না। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর বড় সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে।
সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়নের কাইচতলী, তুলাতুলি ও লতাবইন্যা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ নিচু জমি ও জলাশয় মাছ চাষের জন্য উপযোগী হলেও সেগুলোর বড় অংশই ব্যবহারহীন। কোথাও পুরনো পুকুর শুকিয়ে গেছে, কোথাও সংস্কারের অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সামান্য উদ্যোগ ও বিনিয়োগেই যেসব জলাশয় উৎপাদনে আনা সম্ভব, সেগুলো বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে রয়েছে।
কাইচতলী এলাকার বাসিন্দা মো. জিয়াবুল হক জানান, তাঁর প্রায় চার একর জমি মাছ চাষের উপযোগী। “পুকুর নির্মাণে অনেক টাকা লাগে। আমার পক্ষে সম্ভব না। পুরনো একটি প্রজেক্ট আছে, সেটিও সংস্কার করতে পারিনি। সহায়তা পেলে মাছ চাষ শুরু করতে চাই,” বলেন তিনি। একই এলাকার মোঃ শামসুল ইসলাম জানান, তাঁর একটি পুকুর পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। জায়গাটি মাছ চাষের জন্য উপযোগী হলেও অর্থের অভাবে সংস্কার করতে পারেননি। “মৎস্য বিভাগে আবেদন করেছি। সহায়তা পেলে আবার মাছ চাষ শুরু করব,” বলেন তিনি। এছাড়া স্থানীয় আরও কয়েকজন চাষি—মো. সোহেল ও মো. শহিদ—নতুন পুকুর নির্মাণ ও পুরনো জলাশয় সংস্কারের আগ্রহের কথা জানালেও সবার মুখে একই অভিযোগ, অর্থের অভাবই বড় বাধা।
মাঠপর্যায়ের চিত্রে দেখা গেছে, পাহাড়ি ঢাল ও নিচু এলাকায় স্বাভাবিকভাবে পানি জমে থাকায় এসব জায়গা মাছ চাষের জন্য বেশ উপযোগী। কিন্তু পুকুর খনন বা সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় চাষিরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন না। অনেক জলাশয় দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ধীরে ধীরে অনুপযোগী হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান জেলায় বছরে প্রায় ১.৪৪ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়, যা জাতীয় উৎপাদনের তুলনায় খুবই কম। স্থানীয় বাজারদর অনুযায়ী এই খাত থেকে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হলেও সম্ভাবনার তুলনায় তা অনেক কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৎস্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে পুকুর খনন, পুনঃখনন, সংস্কার, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং অনেক চাষি ইতোমধ্যে আবেদনও করেছেন। তবে চাষিদের অভিযোগ, সহায়তা পেতে সময় লাগে এবং সবাই এখনো এর আওতায় আসতে পারেননি। ফলে বাস্তবায়নের গতি আরও বাড়ানো এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদারের দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ খালেকুজ্জামান সরকার বলেন, তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দরবান জেলা মাছ চাষের জন্য সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময়। বিশেষত মৃত ঝিরিগুলোকে ক্রিকে পরিণত করা হলে এবং পোনার সহজপ্রাপ্যতা করতে পারলে মাছ চাষে নতুন কর্মস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আবার স্থানীয় মানুষের পুষ্টির চাহিদাও খুব সহজে পূরণ করা সম্ভব হবে। বান্দরবান পার্বত্য জেলায় এই খাতকে আরো সমৃদ্ধ এবং উন্নত করার লক্ষ্যে নানা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ এই খাতে আরো অধিক উপকারভোগীকে মাছ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
অবহেলায় পড়ে থাকা জলাশয়: সামান্য সংস্কারেই হতে পারে মাছ চাষের সম্ভাবনাময় উৎস, তবু অর্থাভাবে ব্যবহার হচ্ছে না।
আপনার মতামত লিখুন :