হাওরে পানির নিচে বোরো ধান: পচন, দামে ধস, কৃষকের বেঁচে থাকার লড়াই

মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চলে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে পচে নষ্ট হচ্ছে। যেসব ধান কৃষকেরা কেটে স্তুপ করে রেখেছিলেন, সেগুলোর বড় অংশও পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাওরপাড়ের হাজারো কৃষক।

কৃষকেরা জীবন বাজি রেখে বুক বা গলা সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন। কেউ নৌকা, আবার কেউ কলাগাছের ভেলা ব্যবহার করে পানির নিচ থেকে ধান কেটে বাড়িতে আনছেন।

অনেক ক্ষেত্রে সেই ধান ভালোভাবে শুকানো সম্ভব হচ্ছে না। টানা মেঘলা আকাশ ও রোদের অভাবে ভেজা ধান থেকে অঙ্কুর গজাচ্ছে, ফলে তা বাজারে বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

গত সোমবার (৪ মে) দুপুরের পর কিছু সময়ের জন্য সূর্যের দেখা মেলায় কৃষকেরা স্তুপে রাখা ধানে রোদ লাগানোর চেষ্টা করেন। তবে আবহাওয়া অনিশ্চিত থাকায় স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। যদিও গত ২৪ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কিছুটা আশার আলো দেখছেন তারা।

হাওরাঞ্চলে বর্তমানে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত পানির কারণে শ্রমিকেরা জমিতে নেমে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে, জমিতে পানি জমে থাকায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার ব্যবহার করাও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ধান কাটার কাজ পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে।

মনু প্রকল্পের ভেতরে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে পানির নিচে তলিয়ে থাকা ধান পচে যাচ্ছে। কৃষকের অভিযোগ_প্রকল্পের সব পাম্প সচল না থাকায় পানি দ্রুত নামানো সম্ভব হয়নি। এতে করে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।

আখাইলকুড়া ইউনিয়নের শেওয়াইজুড়ী এলাকার কৃষক বাবর মিয়া জানান, “প্রতি বিঘা জমির ধান পানির নিচ থেকে কাটতে ৪ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। অনেক ধান পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। যদি পাম্প সচল থাকত, তাহলে এভাবে ধান নষ্ট হতো না।”

মিরপুর এলাকার কৃষক জুনেদ মিয়া বলেন, “১০ বিঘা জমির মধ্যে মাত্র ১ বিঘার ধান কাটতে পেরেছি। বাকি ৯ বিঘা জমির ধান এক সপ্তাহ ধরে পানির নিচে। কতটুকু ভালো থাকবে বুঝতে পারছি না।”

মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ ধানের দাম ছিল ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৫০০ টাকায়। ভেজা ও অঙ্কুরিত ধান বাজারে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচও উঠছে না।

বিরাইমাবাদ এলাকার কৃষক আব্দুল আহাদ বলেন, “শুরুতে ৭০০ টাকায় ধান বিক্রি করেছি। এখন তা ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। রোদের অভাবে ধান শুকাতে না পারায় দাম আরও কমছে।”

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৬২,৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ২৭,৩৫৫ হেক্টর। টানা বৃষ্টিতে ইতোমধ্যে ২,৪৪২ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সারাদেশে বোরো ধান সংগ্রহ শুরু হলেও মৌলভীবাজারে এখনও তা শুরু হয়নি। বৈরী আবহাওয়া ও হাওরাঞ্চলের নিমজ্জিত জমির কারণে কৃষকেরা ধান তুলতে না পারায় সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমও পিছিয়ে আছে। এ বছর জেলায় ৬ হাজার ৪ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

হাওরের কৃষকরা এখন প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। একদিকে পানির নিচে পচে যাওয়া ধান, অন্যদিকে বাজারে দামের ধস—সব মিলিয়ে তাদের সামনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। দ্রুত পানি নিষ্কাশন, শ্রমিক সহায়তা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

 

Advertisement

Link copied!