পর্ব- ০১
পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ ও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা
২০২৬ সালের ১০ মে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের মাঠে প্রাইম মিনিস্টার তারেক রহমান পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬- এর উদ্বোধন করেন। চার দিনব্যাপী এই আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল-"আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ"। শুধু কুচকাওয়াজ ও পদক বিতরণী নয়; এই আয়োজন ছিল এক বড় অঙ্গীকারের বার্তাবাহক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশের যৌক্তিক দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি দেন, আর প্রধানমন্ত্রী মোব ভায়োলেন্স, কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ডাক দেন। কিন্তু এই প্রতিপাদ্যের মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনী আসলে কী বার্তা দিতে চেয়েছে? এটি কি নিছক উৎসবের স্লোগান, না ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্থাপত্যের এক স্পষ্ট রূপরেখা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ইতিহাসের পাঁচ মহা-অধ্যায় পেরোতে হবে: (১) ব্রিটিশ উপনিবেশিক উত্তরাধিকার, (২) পাকিস্তান আমল ও স্বাধীনতা-পূর্ব বিবর্তন, (৩) মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের প্রথম প্রতিরোধ, (৪) স্বাধীনতার পর জনআস্থার ক্রমবর্ধমান সংকট ও গণতান্ত্রিক ব্যর্থতা, এবং (৫) ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও সংস্কারের অনিবার্যতা। এই পাঁচটি অধ্যায়ের গভীর পাঠ আমাদের দেখাবে কেন পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬-এর প্রতিপাদ্যটি কেবল একটি স্লোগান নয়-বরং এটি আসন্ন পঞ্চাশ বছরের রূপান্তরের ভিত।
১. ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার: ব্রিটিশ আমলের পুলিশ কাঠামো ও ১৮৬১ আইন
১.১ ১৮৫৭-এর বিদ্রোহ ও দমন-নির্ভর পুলিশের জন্ম
ব্রিটিশ ভারতের পুলিশ কাঠামোর ভিত্তি রচিত হয়েছিল ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনে (Police Act, ১৮৬১ Act V of ১৮৬১)। এই আইনটি ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে প্রণীত হয়। বিদ্রোহ দমন ও জনগণের ওপর শাসকগোষ্ঠীর আধিপত্য বজায় রাখাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। বাংলাপিডিয়ার ভাষ্যমতে, "এই আইনটি ভারতের আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থার মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত এবং এ আইনের অধিকাংশ বিধান এখনও পূর্ণমাত্রায় কার্যকর রয়েছে"।
আইনটির বৈশিষ্ট্য কী? প্রথমত, এটি পুলিশকে একটি পৃথক ও কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। দ্বিতীয়ত, এতে পুলিশের দায়িত্ব 'শাসকের প্রতি আনুগত্য' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, 'জনসেবা' হিসেবে নয়। লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের এক ব্লগে বলা হয়েছে, "এই আইনের সুস্পষ্ট ক্ষমতাগত কাঠামো হলো শাসক ও প্রজার, যেখানে দমন-নিপীড়নই অগ্রাধিকার"।
১.২ পুলিশ কাঠামোর সাংগঠনিক রূপ
আইন অনুযায়ী একজন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) থাকবেন, যিনি সরাসরি সরকারের কাছে দায়ী থাকবেন। জেলা পর্যায়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে পুলিশ সুপার ও ওসি নিয়োগের ব্যবস্থা থাকে। এটি সার্কুলার দিয়ে পরিবর্তন করা হলেও আন্তঃ বিভাগীয় মনস্তাত্ত্বিক প্রতিযোগিতা এখনও শেষ হয় নাই বরং এটি এর প্রভাব জনগণের মধ্যে বিস্তারিত হচ্ছে।
এই কাঠামোয় পুলিশ স্থানীয় জনগণের জন্য জবাবদিহি নয়, বরং প্রশাসনিক উর্ধ্বতনদের কাছে জবাবদিহি করে। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের ৫৩১ টি থানা ও ২,১৪,১৭৬ সদস্য নিয়েও মূল সাংগঠনিক নকশা ১৮৬১ সালের সেই আইনের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।
১.৩ ১৮৬১ আইনের কালো ছায়া
আজকের বাংলাদেশের পুলিশ এখনও কার্যত একই আইনের অধীনে পরিচালিত। "একটি ১৮৬১-শৈলীর বাহিনী দমনের জন্য নকশা করা হয়েছিল, সুরক্ষার জন্য নয়,"-নিউএইজের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউএনডিপি-র ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, "হৃদয়ে পুলিশ রূপান্তরের জরুরি প্রয়োজন হলো ১৮৬১-এর আইন থেকে সরে আসা-একটি আইন যা সেবার চেয়ে নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয়"। আরেকটি বিশ্লেষণে বলা হয়, "এই আইন পুলিশের মধ্যে একটি ঔপনিবেশিক মানসিকতা ধরে রেখেছে, যেখানে কর্মকর্তারা পুলিশকে জনসেবক হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বাহক হিসেবে কাজ করে"। ১৮৬১ সালের Police Act। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়; বরং ঔপনিবেশিক শাসনকে টিকিয়ে রাখা, বিদ্রোহ দমন করা এবং স্থানীয় জনগণের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
এই পুলিশ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ছিল-কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ; কঠোর আমলাতান্ত্রিক কাঠামো; জনগণের পরিবর্তে সরকারের প্রতি আনুগত্য; বলপ্রয়োগকেন্দ্রিক আইন প্রয়োগ; স্থানীয় জনগণের উপর নজরদারি ও দমন।
ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী পুলিশকে "জনসেবক" হিসেবে নয়, বরং "শাসকের শক্তি” হিসেবে গড়ে তোলে। এই উপনিবেশিক উত্তরাধিকার আজও পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দেয়াল তৈরি করে রেখেছে। পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬-এ 'আমার পুলিশ, আমার দেশ' স্লোগানটি তখনই সত্যিকারের অর্থবহ হবে যখন এই ১৬৪ বছরের পুরনো আইনের জায়গায় একটি নতুন, জনমুখী ও জবাবদিহিমূলক আইন তৈরি হবে।
২. পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ: পুলিশ প্রশাসনের বিবর্তন
২.১ দেশভাগ ও ইস্ট বেঙ্গল পুলিশ
১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে পুলিশের নাম হয় 'ইস্ট বেঙ্গল পুলিশ'। পরবর্তীতে এটি পরিবর্তিত হয়ে 'ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ' নাম ধারণ করে। পাকিস্তান আমলের পুলিশ প্রশাসন পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। প্রশাসনিক কাঠামো, নীতি ও বাজেটের অধিকাংশ সিদ্ধান্ত করাচি বা পরবর্তীতে রাওয়ালপিন্ডি থেকে নেওয়া হত। পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশকে প্রায়ই সংখ্যালঘিষ্ঠ পশ্চিম পাকিস্তানি সুশাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
২.২ ভাষা আন্দোলন থেকে সামরিক শাসন: পুলিশের দ্বিধাবিভক্ত ভূমিকা
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে পুলিশ প্রথমে সরকারি নির্দেশে ১৪৪ ধারা জারি ও ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একাংশ পুলিশ সদস্য মায়ের ভাষার দাবিতে নীরব সমর্থন জানান। এরপর ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের শাসনামলে পুলিশকে কেন্দ্রীয় সরকারের গোয়েন্দা নির্ভর একটি যন্ত্রে পরিণত করা হয়।
২.৩ ছয় দফা ও আগরতলা মামলায় পুলিশের ভূমিকা
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা আন্দোলনকে দমন করতে পুলিশকে ব্যবহার করা হয়। আগরতলা মামলায় পুলিশ গোয়েন্দা বিভাগের ভূমিকা ছিল প্রকাশ্য এবং রাজনৈতিক। এই সময়ের মধ্যেই পুলিশের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়-যারা উপনিবেশিক মানসিকতা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন, আর যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। এই বিবর্তন আমাদের শেখায়, যতক্ষণ না পুলিশ বাহিনী রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয় ও সাংবিধানিক কর্তৃত্ব নিজের জায়গায় পায়, ততক্ষণ জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
৩. মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ: প্রথম প্রতিরোধ ও বীরত্বের ইতিহাস
৩.১ রক্তাক্ত ২৫ মার্চ: রাজারবাগে প্রথম প্রতিরোধ
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু করলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস-ই প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। নিরীহ ঘুমন্ত পুলিশ সদস্যদের ওপর আচমকা হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনারা। তবুও রাজারবাগের পুলিশ সদস্যরা মরণপণ লড়াই করেন। এই প্রতিরোধের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল ও অন্যান্য বাঙালি কর্মকর্তারা। স্মৃতি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে হামলা চালায়। সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এই ঘটনার সাথে জড়িত নামগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিআইজি শেখ আবদুল খালেক, ডিআইজি এ.এস.এম. আবদুল হালিম, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আজিজুর রহমান, ওসি আব্দুল লতিফ প্রমুখ। (মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ: প্রথম প্রতিরোধ ও বীরত্বের ইতিহাস)
তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান পুলিশের বাঙালি সদস্যরা কেবল রাজারবাগেই নয়-ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশের পুলিশ লাইনস ও থানা থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাসে তারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেন এবং মুক্তাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন।
৩.২ পুলিশ সদস্যদের বীরত্ব ও স্বীকৃতি
মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর অবদানের জন্য তাদের 'স্বাধীনতা পদক'-এ ভূষিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার জন্য অনেককে বীরত্বপূর্ণ খেতাবে ভূষিত করা হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা ছিল বীরত্বের-শুধু মুক্তিযুদ্ধেই নয়, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণেও পুলিশের রয়েছে ঈর্ষণীয় সাফল্য।
৩.৩ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও পুলিশের বর্তমান কর্তব্য
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু অতীতের গৌরব নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। আজকের পুলিশের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলো-অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, পাকিস্তানি হানাদারদের মতো শোষণের বিরুদ্ধে জনগণের পক্ষে প্রতিবাদ জানানো, এবং নিপীড়িত জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। মূলত: এই চেতনা থেকেই জন্ম নেয় সংস্কারের অপরিহার্যতা।
৪. স্বাধীন বাংলাদেশে পুলিশ প্রশাসনের বিবর্তন
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ পুলিশকে একটি নতুন রাষ্ট্রের বাস্তবতায় কাজ শুরু করতে হয়। কিন্তু নতুন সংবিধান, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও পুলিশ প্রশাসনের কাঠামোতে মৌলিক সংস্কার খুব সীমিত ছিল। ১৮৬১ সালের Police Act কার্যত বহাল থাকে। ফলে প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে উপনিবেশিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে।
১৯৭০-এর দশক থেকে শুরু করে সামরিক শাসনের সময় পুলিশকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও বিরোধী মত দমনের জন্য ব্যবহার করা হয়। পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোও অনেক ক্ষেত্রে একই প্রবণতা অনুসরণ করে। ফলে পুলিশ ধীরে ধীরে দলীয় প্রভাব, বদলি-বাণিজ্য, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং প্রশাসনিক চাপের মধ্যে পড়ে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশে পুলিশের বিবর্তনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো:
ক. সামরিক শাসন ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক পুলিশিং:
সামরিক শাসনের সময় পুলিশকে জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নে অনেক সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
খ. গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও নতুন প্রত্যাশা:
১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল-পুলিশ জনগণের সেবক হবে। কিন্তু রাজনৈতিক মেরুকরণ, দলীয়করণ এবং প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
গ. সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদবিরোধী সক্ষমতা বৃদ্ধি:
২০০০-এর দশকে জঙ্গিবাদ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের উত্থান বাংলাদেশ পুলিশকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। কাউন্টার টেররিজম, গোয়েন্দা সক্ষমতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের মাধ্যমে পুলিশ নতুন দক্ষতা অর্জন করে।
ঘ. ডিজিটাল যুগের পুলিশিং:
সাইবার অপরাধ, ডিজিটাল নিরাপত্তা, অনলাইন প্রতারণা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্ক মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশ প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম বাড়াতে শুরু করে। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল নজরদারি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কও সৃষ্টি হয়।
ঙ. আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে ভূমিকা:
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের অংশগ্রহণ বাহিনীর পেশাদার সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। নারী পুলিশ সদস্যদের অংশগ্রহণও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
তবে এসব ইতিবাচক অগ্রগতির পাশাপাশি মানবাধিকার, জবাবদিহিতা, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ, রাজনৈতিক ব্যবহার এবং জনআস্থার সংকট পুলিশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
৫. গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জনআস্থার সংকট: এক অবক্ষয়ের কাহিনী
কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের বৈধতা নির্ভর করে জনগণের আস্থার উপর। যদি জনগণ বিশ্বাস করে যে পুলিশ নিরপেক্ষ, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক-তাহলে আইন প্রয়োগ সহজ হয়। কিন্তু যদি পুলিশকে রাজনৈতিক বা দমনমূলক শক্তি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বিষয় জনআস্থার সংকট তৈরি করেছে: সেগুলো এইভাবে চিহ্নিত করলে অযাচিত হবে না; তা হলো :
৫.১ রাজনৈতিক প্রভাব ও পুলিশের 'দলীয়করণ'
স্বাধীনতার পর পরবর্তী পাঁচ দশকে পুলিশ বাহিনী বারবার রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হয়েছে। দি ডেইলি স্টারের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, "দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের পুলিশ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে গভীরভাবে আপস করেছে। ক্ষমতাসীন দলগুলো পুলিশকে তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে"। ২০২৪ সালের অক্টোবরে 'দেশ রূপান্তর' প্রতিবেদনে বলা হয়, "দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আবদ্ধ হয়ে আছে; ক্ষমতায় যাওয়া ও টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলো পুলিশকে ব্যবহার করেছে"। বিশেষ করে গত দুই দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশের 'দলীয়করণ' আরও প্রকট হয়।
৫.২ গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
মানবাধিকার সংকট পুলিশের জনআস্থার চরম অবক্ষয় ঘটিয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) ২০২১ সালের প্রতিবেদনে জানায়, "বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা সহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, বিশেষ করে জোরপূর্বক গুম এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে"। গুমের ঘটনায় এক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গুমের ঘটনার ২৩ শতাংশের জন্য পুলিশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী। 'এলিট পুলিশ ইউনিট' র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), ডিবি ও সিটিটিসির বিরুদ্ধেও গুম, হেফাজতে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
৫.৩ জনআস্থার চরম সংকট
সার্ভে অনুযায়ী, পুলিশকে প্রায়ই সবচেয়ে কম আস্থার ও সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নাগরিকদের কাছে পুলিশ এখন 'ভয়' ও 'অবিশ্বাসের' প্রতীক, 'আশ্রয়' নয়। এই অবস্থার কারণে অনেক এলাকায় জনতা নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে (মব জাস্টিস), যা আইনের শাসনের জন্য আরেকটি বড় হুমকি। এছাড়াও পুলিশের বিরুদ্ধে হয়রানি ও দুর্নীতির অভিযোগ; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রশ্নে বিতর্ক; সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব ইত্যাদি অভিযোগ তো বলবৎ রয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো-পুলিশ সদস্যরাও অনেক সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের শিকার হন। ফলে একটি অসুস্থ কাঠামো কেবল জনগণকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং পেশাদার পুলিশ সদস্যদেরও নৈতিক ও পেশাগত সংকটে ফেলে। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ আমাদের খুজে বের করতে হবেই।
৬. ২০২৪: জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পুলিশের দ্বিধাবিভক্ত ভূমিকা
৬.১ কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা ও পুলিশের প্রথম প্রতিক্রিয়া
২০২৪ সালের জুনের শেষ থেকে শুরু হয় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলন। প্রথম দিকে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ব্যবহার ও ব্যাপক গ্রেফতারের ঘটনা ঘটায়। ১৭ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে সারা দেশে কমপক্ষে ৫,০০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু আন্দোলনের চরম সহিংস রূপ নিলে পুলিশের ভেতর দ্বিধা তৈরি হয়।
৬.২ আগস্ট ৫, ২০২৪: পুলিশের ভূমিকা ও গণঅভ্যুত্থানের পরিণতি
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এই সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে; একদিকে অনেক পুলিশ সদস্য আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়, মৃত্যু ঘটায়, অন্যদিকে অনেকে দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তী পর্যায়ে জুলাই গণহত্যার মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালের মে মাসে আটজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। সূত্র অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের হত্যা ও সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা ১,৮৫৫টি মামলার ৯০ শতাংশের বেশি তদন্ত প্রায় দুই বছরেও শেষ করতে পারেনি পুলিশ। তবে গুরুত্ব বিবেচনায় আইজিপি এর নেতৃত্বে একটি মনিটরিং সেল কাজ করছেন এবং একই কাজ বিভাগীয় ও জেলা পুলিশ মনিটরিং সেলেও তদন্ত তদারকি হচ্ছে।
৬.৩ পুলিশের 'সংস্কার অনিবার্যতা'
২০২৪ সালের আগস্টের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। এই সরকার পুলিশ সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠনের ঘোষণা দেয়। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান পুলিশের জন্য এক বড় বেকআপ কল-ঔপনিবেশিক মানসিকতা ও রাজনৈতিক নির্ভরশীলতা ভেঙে নতুন করে শুরু করার সুযোগ। ২০২৪-এর পরবর্তী সংস্কার দর্শন স্পষ্ট: পুলিশকে জনগণের পুলিশ হতে হবে; না হলে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন অটুট থাকবে না।
৭. সংস্কারের মহাপরিকল্পনা: পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ
৭.১ কমিশন গঠন ও তার প্রতিবেদন (২০২৪-২০৫০)
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে-সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশ। পুলিশ সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান প্রখ্যাত আইনবিদ ড. সরফরাজ চৌধুরী। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি কমিশন তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়। ১১০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে মোট ১০৮টি সুপারিশ পেশ করা হয়। কমিশন বলপ্রয়োগ, গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জিজ্ঞাসাবাদ, মামলা রুজু, তদন্ত, ভেরিফিকেশন ও মানবাধিকার চর্চাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দেয়। সংক্ষেপে, প্রতিবেদনটিকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়: স্বল্পমেয়াদি (পুলিশের ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শ যাচাই বন্ধ), মধ্যমেয়াদি (পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার কমিশনকে বাস্তব ক্ষমতা দেওয়া), এবং দীর্ঘমেয়াদি (১৮৬১ সালের আইন বাতিল ও নতুন আইন প্রণয়ন, সম্প্রদায় ভিত্তিক পুলিশিং জোরদার)।
৭.২ মূল সুপারিশসমূহের সারসংক্ষেপ:
• ১৮৬১ আইনের বিলোপ ও নতুন জনমুখী আইন: পুলিশের ভূমিকা 'নিয়ন্ত্রণ'-এর বদলে 'সেবা' হবে।
• স্বাধীন পুলিশ কমিশন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন কমিশন পুলিশের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা দেখবে।
• মানবাধিকার সুরক্ষা: গণগ্রেফতার বন্ধ; বিশেষ করে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ ও বলপ্রয়োগের ওপর কঠোর নির্দেশনা। এনএইচআরসি-কে পুলিশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তের পূর্ণ ক্ষমতা।
• যাচাই প্রক্রিয়ায় সংস্কার ও রাজনৈতিক মতাদর্শ বর্জন: চাকরিপ্রার্থীদের স্থায়ী ঠিকানা যাচাই বাধ্যতামূলক নয় এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিত্তিক যাচাই বন্ধ।
• অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার: জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত আহতদের মেধাভিত্তিক চাকরি প্রদান ও স্বাধীন বার্ষিক অডিটের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সবার আগে উন্নয়ন: পুলিশের কাজ যেন উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার হাতিয়ার হয়, জনদমনের বাহন নয়।
যদি আমরা ২০২৬-২০৭৬ সালের রূপান্তর ও সংস্কারের সঠিক দর্শন অনুসরণ করি, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ বিশ্বের একটি রোল মডেল হবে-একটি গণমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী। আর ২০৭৬ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষে আমরা সেই বাংলাদেশের পথে পৌঁছাব, যেখানে পুলিশ দেখাবে 'আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ' কেবল স্লোগান নয়-বাস্তবতা। এই ভিশনের আলোকে পরবর্তী অন্তত ৮ টি পর্বে পুলিশ ভাবুকদের চিন্তার খোরাক দেওয়ার চেষ্টা চালাব। পরের ধারাবাহিক পর্ব রচনা গুলোর দৃষ্টি আকর্ষন করা হলো।
শেষ কথা- পুলিশ সংস্কার কোনো এককালীন ইভেন্ট নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণ জরুরি-রাষ্ট্রের, সরকারের, সিভিল সোসাইটির, পুলিশের সদস্যদের এবং সর্বোপরি দেশের সাধারণ মানুষের। কারণ নিরাপত্তা সবার প্রাপ্য, কিন্তু নিরাপত্তা দিতে হলে সংস্কার আবশ্যিক।
লেখক:
ড. মোঃ আশরাফুর রহমান
অতিরিক্ত আইজিপি, অব: বাংলাদেশ পুলিশ।
আপনার মতামত লিখুন :