বাংলাদেশ পুলিশ: ২০২৬-২০৭৬: পরিকল্পনা-২০২৬-২০৩৫: স্মার্ট পুলিশিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নিরাপত্তা দর্শন

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৫ মে, ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম

পর্ব-২

মানবসভ্যতা প্রযুক্তির প্রতিটি উল্লম্ফনের সঙ্গে সঙ্গে শাসনব্যবস্থার ধরন বদলে দিয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পূর্ণাঙ্গ উত্তরণকালে বাংলাদেশ ২০২৬-২০৩৫ সময়পর্বে প্রবেশ করছে, যেখানে প্রযুক্তি ও জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র পরস্পর গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার অভিলক্ষ্য ঘোষণা করেছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুশাসন ও নাগরিক নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ বাংলাদেশ পুলিশ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসেও বাংলাদেশ পুলিশের বড় একটি অংশ নির্ভর করছে কাগজভিত্তিক রেকর্ড, সীমিত তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞান এবং প্রথাগত প্রতিক্রিয়াশীল টহলব্যবস্থার ওপর। পুলিশ-জনতার মাঝে আস্থার ঘাটতি, তদন্তে স্বচ্ছতার অভাব এবং অপরাধের উৎস নির্ণয়ে ধীরগতি এখনও প্রকট।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পুলিশের নিরাপত্তা দর্শন 'স্মার্ট পুলিশিং' আকারে নতুন মাত্রা পাচ্ছে-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্স, রিয়েল-টাইম ডেটা প্রসেসিং এবং অটোমেশন নির্ভর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কৌশল এখানে মুখ্য। সাইবার অপরাধ থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং, ড্রোন টহল থেকে শুরু করে ফেসিয়াল রিকগনিশন-প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সম্মিলন ঘটবে মানবিক পুলিশিংয়ের সঙ্গে। এই রূপান্তর শুধু অপরাজনীতি শনাক্তকরণই নয়, বরং আগাম সতর্কতা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নাগরিকবান্ধব সেবার প্রতিশ্রুতি দেয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অনিশ্চিত, দ্রুত সময়ে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বাংলাদেশ পুলিশের ২০২৬-২০৩৫ কৌশলপত্রের মূলে থাকা দর্শন। এই দর্শনই একদিন রূপ দেবে ২০৭৬ সালের নাগরিক নিরাপত্তায় আমাদের কাঙ্ক্ষিত পুলিশের ঠিকানা।

১. চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও স্মার্ট পুলিশিং: ধারণাগত কাঠামো স্মার্ট পুলিশিং বলতে কেবল কম্পিউটার বা সিসিটিভির ব্যবহার বোঝায় না। এটি এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও কার্যপদ্ধতিগত কাঠামো, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে পুলিশ বাহিনী অপরাধের পূর্বাভাস, দ্রুত প্রতিক্রিয়া, সুষ্ঠু সম্পদ বণ্টন এবং সর্বোপরি জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চারটি স্তম্ভ-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), ক্লাউড কম্পিউটিং ও বিগ ডেটা-এই স্মার্ট পুলিশিং-এর ভিত গড়ে তোলে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সবচেয়ে বড় উপহার হলো 'ডেটা'-যা কিনা নতুন তেল। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'হরাইজন ২০৩০' কৌশলগত নথিগুলোতে পুলিশিংকে ডেটা-চালিত হিসেবে গড়ে তোলার ওপর বারবার জোর দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের 'টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা' (SDG 16) শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠনের যে কথা বলে, তাতে স্বচ্ছ, জবাবদিহি ও প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম পুলিশ কাঠামো একটি অপরিহার্য শর্ত।

আন্তর্জাতিক চাহিদার দিকে তাকালে দেখা যায়, উন্নত দেশগুলো এখন পুলিশিং-এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে 'স্মার্ট সিটি' ধারণার সঙ্গে একীভূত করছে। জাপানের 'সোসাইটি ৫.০', চীনের 'স্কাই নেট' নজরদারি, যুক্তরাজ্যের 'ন্যাশনাল ডেটা অ্যানালিটিক্স সলিউশন' (NDAS), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'স্মার্ট পুলিশিং ইনিশিয়েটিভ'-সবই প্রমাণ করে যে পুলিশ বাহিনীকে এখন একটি জ্ঞানভিত্তিক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যা তথ্য সংগ্রহ করে, বিশ্লেষণ করে এবং বাস্তব সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে 'স্মার্ট পুলিশিং' রূপকল্পের প্রথম শর্ত হলো প্রচলিত 'থানা-কেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়ামূলক পুলিশিং' (Reactive Policing) থেকে বেরিয়ে 'তথ্যভিত্তিক দূরদর্শী পুলিশিং' (Proactive & Evidence-based Policing)-এ উত্তরণ। এর জন্য প্রয়োজন অপরাধ বিষয়ক রিয়েল-টাইম ডেটা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং সেই মোতাবেক কৌশলগত সিদ্ধান্তগ্রহণ। ৪IR প্রযুক্তি এ কাজটি সম্ভব করে তুলেছে, কারণ এটি কেবল বিপুল তথ্যের ভাণ্ডার তৈরি করে না, সেই তথ্যের মধ্য থেকে অর্থপূর্ণ প্যাটার্ন (অপরাধপ্রবণতা, সময়-স্থান বিশ্লেষণ, অপরাধী নেটওয়ার্ক) চিহ্নিত করতে পারে।

বাংলাদেশ পুলিশ ইতোমধ্যে কিছু ডিজিটাল উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন ক্রাইম ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CDMS), ই-পুলিশিং পোর্টাল, অনলাইন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, এবং পাইলট ভিত্তিতে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার। ২০২৬ সালের ১০ আগস্ট থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সকল থানায় অনলাইন জেনারেল ডায়েরি (জিডি) কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা নাগরিকদের ঘরে বসেই জিডি করার সুযোগ করে দিয়েছে কিন্তু এই উদ্যোগগুলো এখনও বিচ্ছিন্ন, আন্তঃ-পরিচালনাযোগ্যতা (interoperabilit) কম এবং সর্বোপরি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বা প্রেডিক্টিভ নয়। ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সাল হবে সেই সন্ধিক্ষণ, যখন এই প্রযুক্তিগুলোকে এক সুসংহত 'স্মার্ট পুলিশিং ইকোসিস্টেম'-এ রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

এই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ বেছে নিতে হবে। উন্নত দেশগুলোর মতো অঢেল সম্পদ ও প্রযুক্তিগত ভিত আমাদের নেই, কিন্তু জনমিতিক লভ্যাংশ, বর্ধিষ্ণু ডিজিটাল অবকাঠামো এবং সরকারের স্মার্ট বাংলাদেশ অঙ্গীকার আমাদের একটি অনুকূল সূচনাবিন্দু দিচ্ছে। বর্তমানে দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষ ৪জি মোবাইল ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কের আওতায় চলে এসেছে, এবং ২০২৫ সালের শেষ দিকে ৫জি নেটওয়ার্কও বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে।

২. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত অপরাধ সনাক্তকরণ ও প্রেডিক্টিভ পুলিশিং স্মার্ট পুলিশিং-এর সবচেয়ে রূপান্তরকারী দিক হলো অপরাধ সংঘটনের আগেই তা চিহ্নিত ও প্রতিহত করার সক্ষমতা, যা প্রেডিক্টিভ পুলিশিং নামে পরিচিত। স্মার্ট পুলিশিং-এর সবচেয়ে বিপ্লবী অধ্যায় হলো প্রেডিক্টিভ পুলিশিং, যা অপরাধের ভূগোল, কাল ও কারণ বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট স্থান ও সময়ে অপরাধের সম্ভাবনা পূর্বাভাস দেয়। এর পেছনে কাজ করে জটিল সব মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম।

২.১ উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (LAPD) ও সান্তা ক্রুজে ব্যবহৃত 'প্রেডপোল' সফটওয়‍্যারটি ঐতিহাসিক অপরাধের ডেটা বিশ্লেষণ করে একটি মানচিত্র তৈরি করে, যা অপরাধের হটস্পট চিহ্নিত করে। এতে করে সম্পদ সঠিক জায়গায় মোতায়েন করে ছিনতাই ও চুরির ঘটনা প্রায় ২০% কমানো সম্ভব হয়েছে। যুক্তরাজ্যে 'হার্ট' (Harm Assessment Risk Tool) মডেল ব্যবহার করে গৃহ নির্যাতনের মতো সহিংস অপরাধের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি পরিমাপ করা হয়। চীনের সাংহাই ও শেনঝেন শহরে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত এআই সিস্টেম পাবলিক স্পেসে ওয়ান্টেড অপরাধীকে চিহ্নিত করতে সক্ষম। সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্স 'সেন্সমেকিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যেখানে আইওটি সেন্সর, সিসিটিভি এবং সোশ্যাল মিডিয়া ফিড একীভূত করে রিয়েল-টাইম অ্যানালিটিক্স প্রদান করা হয়। এস্তোনিয়া তার ই-গভর্নেন্স মডেলে পুলিশের ডিজিটাল সিস্টেমকে জাতীয় এক্স-রোড ডেটা লেয়ারের সঙ্গে যুক্ত করেছে; সেখানে এআই শুধু অপরাধ নয়, ট্রাফিক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বিশ্লেষণ করে। ভারতের দিল্লি পুলিশ 'ক্রাইম ম্যাপিং অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড প্রেডিক্টিভ সিস্টেম' (CMAPS) চালু করেছে, যা স্থানভিত্তিক অপরাধের পূর্বাভাস দেয়।

২.২ বাংলাদেশে প্রয়োগ কৌশল ও বর্তমান অগ্রগতি বাংলাদেশ পুলিশের কাছে এআই-চালিত প্রেডিক্টিভ মডেল তৈরি করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় অপরাধ ডেটা গুদাম, যেখানে সকল থানার এফআইআর, তদন্ত তথ্য, আদালতের নিষ্পত্তি, অপরাধীদের প্রোফাইল ও জেল থেকে ছাড়া পাওয়া ব্যক্তিদের তথ্য রিয়েল-টাইমে সংরক্ষিত হবে। বাংলাদেশ পুলিশের জন্য এআই-চালিত অপরাধ সনাক্তকরণ মডেল গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই একটি সমন্বিত জাতীয় অপরাধ ডেটাবেজ প্রয়োজন, যেখানে সব থানার এফআইআর, তদন্ত প্রতিবেদন, কেস ডায়েরি, আদালতের রায় এবং ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট রিয়েল-টাইমে সংরক্ষিত ও আপডেট হবে।

বাংলাদেশ পুলিশ ইতোমধ্যেই এই পথে অগ্রসর হতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ নয়টি অ্যাপ ও সফটওয়্যার চালু করেছে। এসব সফটওয়্যারের মধ্যে রয়েছে রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ভায়োলেশন ডিটেকশন সিস্টেম (যা এআই ব্যবহার করে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে), হোটেল বোর্ডার ইনফরমেশন সিস্টেম এবং নাগরিকদের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগের আধুনিক মাধ্যম 'হ্যালো ডিএমপি' অ্যাপ। এই অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকরা সহজেই বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারবেন এবং অভিযোগ জানাতে পারবেন। এটি স্মার্ট পুলিশিংয়ের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই ডেটার ওপর ভিত্তি করে একটি মেশিন লার্নিং মডেল তৈরি করতে হবে, যা নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম:

• হটস্পট ম্যাপিং: শহর বা গ্রামের কোন পকেটে ছিনতাই, চুরি বা মাদক লেনদেনের সম্ভাবনা বাড়ছে।

• জঙ্গি ও সন্ত্রাসী গতিবিধি: সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং, আর্থিক লেনদেনের প্যাটার্ন ও মোবাইল টাওয়ার ডেটা বিশ্লেষণ করে নাশকতার আগাম সতর্কতা।

•সাইবার অপরাধ পূর্বাভাস: ফিশিং, র‍্যানসমওয়্যার (Ransomware) ও ডিজিটাল জালিয়াতির নতুন কৌশল সম্পর্কে আগাম ধারণা।

২০২৬-২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আওতায় 'পাইলট প্রেডিক্টিভ পুলিশিং ল্যাব' গঠনের প্রস্তাব করা যায়। বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগ, ডেটাসফট ও অন্যান্য স্থানীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবকদের সঙ্গে অংশীদারিত্বে একটি ওপেন-সোর্স ভিত্তিক প্রেডিক্টিভ মডেল তৈরি হবে, যা প্রথমে রাজধানীর ছিনতাই ও মোবাইল ফোন চুরির প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করবে। এই মডেলটি এলাকার আর্থ-সামাজিক সূচক, উৎসবের মৌসুম, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও গণপরিবহনের সময়সূচির মতো ভ্যারিয়েবল বিবেচনায় নিয়ে একটি 'হিট ম্যাপ' তৈরি করবে। টহল পুলিশের কমান্ডাররা ড্যাশবোর্ড থেকে এই মানচিত্র দেখে পরবর্তী শিফটে কোন মোড়ে বা গলিতে অতিরিক্ত টহল দিতে হবে, তা ঠিক করবেন। তবে এখানে সতর্কতা জরুরি। এআই মডেল পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। উন্নত দেশেও দেখা গেছে, প্রেডপোলের মতো টুল কোনো কোনো সময় নির্দিষ্ট বর্ণ বা নিম্ন-আয়ের বসতিকে টার্গেট করেছে। বাংলাদেশে ইতিহাসগতভাবে কিছু এলাকাকে 'অপরাধপ্রবণ' হিসেবে চিহ্নিত করার সংস্কৃতি আছে। ডেটা যদি সেই সংস্কৃতিকে ধারণ করে, তাহলে এআই একটি আত্মপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণীর মতো আচরণ করবে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাড়তি নজরদারির শিকার বানাবে। ফলে বাংলাদেশে এআই মডেল তৈরির সময় 'ফেয়ার এআই' নীতি গ্রহণ জরুরি, যেখানে নিয়মিত অ্যালগরিদম অডিট এবং মানবীয় তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে হবে। ফলে বাংলাদেশে এআই মডেল তৈরির সময় 'ফেয়ার এআই' নীতি গ্রহণ জরুরি, যেখানে নিয়মিত অ্যালগরিদম অডিট এবং মানবীয় তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে হবে। তাই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল' এবং 'ইলেক্ট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন'-এর পরামর্শ অনুযায়ী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নীতিমালা শুরু থেকেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

২০২৬-২০৩৫ এর জন্য সুপারিশ হলো একটি কেন্দ্রীয় 'এআই পুলিশিং রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইউনিট' গঠন, যা বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মিলে স্বল্প পরিসরে প্রেডিক্টিভ মডেল তৈরি করবে। এই মডেল প্রথমে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় ছিনতাই ও সড়ক অপরাধের ক্ষেত্রে পাইলটিং করা যেতে পারে। তাই অ্যালগরিদম অডিট, ফেয়ারনেস মেট্রিক্স ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের তত্ত্বাবধান একান্ত অপরিহার্য।

৩. বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স ও অপরাধ নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ একক অপরাধ অনেক সময়ই বড় নেটওয়ার্কের অংশ। মাদক চক্র, মানবপাচারকারী চক্র বা সাইবার ক্রাইম গ্রুপের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে ফোন কল, ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেন ও সোশ্যাল মিডিয়া যোগাযোগের মাধ্যমে যুক্ত থাকে। বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স এই বিশাল সম্পর্কগ্রন্থি থেকে প্যাটার্ন বের করতে পারে।

৩.১ আন্তর্জাতিক ব্যবহার উন্নত দেশগুলোর পুলিশ বিভাগ 'পালান্টির' (Palantir Gotham) বা 'আইটু' (i2 AnalystÕs Notebook)-এর মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভিজুয়াল লিঙ্ক চার্ট তৈরি করে। নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস সিস্টেম (DAS) একীভূত করে ৪০০০-এর বেশি ক্যামেরা, লাইসেন্স প্লেট রিডার, অপরাধ রেকর্ড এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্স। জার্মানির ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ (BKA) বিগ ডেটা টুল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং নেটওয়ার্ক উদ্ঘাটন করে। ইসরায়েলি পুলিশ সোশ্যাল নেটওয়ার্ক অ্যানালাইসিস (SNA) প্রয়োগ করে সন্ত্রাসী সেলের 'কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব' খুঁজে বের করে, যা তাদের আগাম আটক করতে সহায়তা করে।

৩.২ বাংলাদেশের জন্য পরিকল্পনা বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) কাছে ইতোমধ্যে প্রচুর অগোছালো ডেটা আছে: কল ডিটেইল রেকর্ডস (CDR), ব্যাংকিং লেনদেন, ভ্রমণ তথ্য, সীমান্ত হাটের গতিবিধি ইত্যাদি। এই ডেটাগুলো বর্তমানে সাইলোতে পড়ে আছে। ২০২৬-২০৩৫ সালে একটি 'ন্যাশনাল পুলিশ ডেটা অ্যানালিটিক্স সেন্টার' (NPDAC) স্থাপন করতে হবে, যেখানে একটি লিগ্যাসি ডেটা ক্লিনিং প্রজেক্টের মাধ্যমে পুরনো ফাইলগুলো ডিজিটাইজ করা হবে এবং তারপর মেশিন লার্নিং মডেল দিয়ে প্যাটার্ন অ্যানালাইসিস চালানো হবে।

উদাহরণ হিসেবে, বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের রুট ও সময় বিশ্লেষণ করতে বিগ ডেটা ব্যবহার করা যেতে পারে। টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম, ঢাকা হয়ে উত্তরবঙ্গে পাচারের পথে কোথায়, কোন সময়ে চেকপোস্ট ফাঁকি দেওয়া হয়, কোন মোবাইল নম্বর বারবার সক্রিয় হয়-এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পাচারকারী চক্রের মূলহোতা পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব। পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট 'র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন' (র‍্যাব) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে যদি একটি কমন বিগ ডেটা প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা যায়, তাহলে এই বিশ্লেষণ আরও শক্তিশালী হবে। তবে এখানেও ডেটা প্রাইভেসির প্রশ্ন উঠবে। ইউরোপের জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেgulation (GDPR) এবং ভারতের প্রস্তাবিত ডেটা সুরক্ষা বিল থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশকে একটি 'পুলিশিং ডেটা প্রোটেকশন গাইডলাইন' প্রণয়ন করতে হবে, যাতে ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার বন্ধ থাকে। ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন ইউনিটে একটি করে ডেটা অ্যানালিটিক্স সেল স্থাপনের লক্ষ্য থাকা উচিত, যা কেন্দ্রীয় NPDAC-র সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে।

৪. স্মার্ট পেট্রলিং সিস্টেম: রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রচলিত পেট্রলিং হয় রুটিনমাফিক এবং অনেক সময় দৃশ্যমানতা নির্ভর। স্মার্ট পেট্রলিং হলো ডেটা-চালিত, যেখানে প্রেডিক্টিভ মডেল থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে টহল বাড়ানো বা কমানো হয়। এর জন্য প্রয়োজন জিআইএস-সক্ষম গাড়ি ট্র্যাকিং সিস্টেম, বডিক্যাম লাইভ ফিড এবং কেন্দ্রীয় কমান্ডসেন্টার।

৪.১ আন্তর্জাতিক মডেল যুক্তরাজ্যের মেট্রোপলিটন পুলিশ 'টোটাল পলিসিং' পদ্ধতিতে জিপিএস ট্র্যাকার, অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন (ANPR) এবং ড্যাশক্যাম একীভূত করে। এটি 'কম্পিউটার এডেড ডিসপ্যাচ' (CAD) ব্যবস্থার অংশ। কেন্দ্রীয় কমান্ডসেন্টার (CAD) দেখে কাছাকাছি থাকা গাড়িকে অপরাধস্থলে পাঠানো হয়। সিঙ্গাপুর পুলিশের 'পলক্যাম ২.০' সিস্টেমে পুলিশের বডিক্যাম, ড্রোন এবং পাবলিক সিসিটিভির ফিড একই প্ল্যাটফর্মে আসে; এআই সেই ফিড বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক জনসমাগম, অযত্নে ফেলে রাখা ব্যাগ বা মারামারির দৃশ্য শনাক্ত করলে সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্ট পাঠায়। দুবাই পুলিশ 'অক্সফোর্ড' স্বয়ংক্রিয় টহল গাড়ি পরীক্ষা করছে, যা চালকবিহীন অবস্থায় নির্দিষ্ট এলাকা মনিটর করে এবং ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরায় রিয়েল-টাইম ফুটেজ পাঠায়।

৪.২ বাংলাদেশে রূপরেখা বাংলাদেশে ২০২৬-২০৩৫ সালের মধ্যে সকল থানার টহল গাড়ি, মোটরসাইকেল ও নৌ-পুলিশের ট্রলারে জিপিএস ট্র্যাকার ও ড্যাশক্যাম স্থাপন করতে হবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তরে একটি সমন্বিত 'সিটি কমান্ড সেন্টার' গড়ে তুলতে হবে, যা ৪IR প্রযুক্তির সহায়তায় 'এককাচ' (Single Pane of Glass) ভিউ প্রদান করবে। অর্থাৎ, একজন শিফট কমান্ডার একটি বড় পর্দায় সমগ্র শহরের টহল ইউনিটের অবস্থান, ঘটনাস্থলের লাইভ ভিডিও এবং নাগরিক রিপোর্ট একসঙ্গে দেখতে পাবেন।

ইতোমধ্যে ডিএমপি কর্তৃক চালু করা 'হ্যালো ডিএমপি' অ্যাপটিকে ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত করে 'সিটিজেন স্মার্ট পুলিশিং অ্যাপ'-এ রূপান্তরিত করা যেতে পারে। নাগরিক এই অ্যাপ থেকে সরাসরি অপরাধের ছবি বা ভিডিও আপলোড করবেন; জিও-ট্যাগিং স্বয়ংক্রিয়ভাবে লোকেশন কমান্ড সেন্টারে পাঠাবে এবং নিকটস্থ টহলদল সেখানে রওনা হবে। এআই ফিল্টার ভুয়া রিপোর্ট ও ডুপ্লিকেট কন্টেন্ট আলাদা করে ফেলবে। উন্নত বিশ্বের দাবি অনুযায়ী, কোনো নাগরিকের জরুরি সহায়তা চাওয়ার সময় তার পরিচয় ও অবস্থান যাচাইয়ে বায়োমেট্রিক লগইনের ব্যবস্থা থাকলে অপব্যবহার রোধ হবে।

তবে স্মার্ট পেট্রলিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ড্রোন। বাংলাদেশ পুলিশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মতো পুলিশকে উপযোগী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, যার অংশ হিসেবে পুলিশে সংযুক্ত হচ্ছে ড্রোন ও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তি। গণজমায়েত, ঈদের জামাত বা রাজনৈতিক সমাবেশের নিরাপত্তায় ড্রোন মোতায়েন করা যেতে পারে, তবে প্রতিটি ফ্লাইটের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের পূর্বানুমতি ও জনগণের গোপনীয়তা সুরক্ষার প্রোটোকল থাকতে হবে। চায়না ও আরব আমিরাতের মতো 'প্রথমে নজরদারি, পরে আইন' মডেল বাংলাদেশের মতো গণতন্ত্রকামী সমাজের জন্য উপযোগী হবে না।

(বিঃদ্র:এই লেখায় আইটি বিশেষজ্ঞের সহযোগিতা রয়েছে)

লেখক:

ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

অতিরিক্ত আইজিপি অব: বাংলাদেশ পুলিশ

Advertisement

Link copied!