পঞ্চগড়ে একদিনে ৩ শিশুর মৃত্যু: পুকুরে ডুবল ভাই-বোন, নদীতে কিশোর

মো. মাহাবুব আলম , ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি পঞ্চগড়

প্রকাশিত: ০১ জুন, ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম

পঞ্চগড়ে পৃথক দুটি মর্মান্তিক ঘটনায় পানিতে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের কেকুপাড়া এলাকায় পুকুরে ডুবে আপন দুই ভাই-বোনের মৃত্যু এবং তেঁতুলিয়ায় নানিবাড়ি বেড়াতে এসে ডাহুক নদীতে ডুবে এক কিশোরের প্রাণহানির ঘটনায় জেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

রোববার (৩১ মে) সন্ধ্যায় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের কেকুপাড়া এলাকায় পুকুরের পানিতে ডুবে আসিফ (১১) ও সাথী আক্তার (৯) নামে আপন দুই ভাই-বোনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তারা একই এলাকার মৃত আইজুল ইসলাম নেন্দরের ছেলে ও মেয়ে এবং স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিশু দুটির বাবা মারা যাওয়ার পর তারা মা আছিয়া খাতুনের সঙ্গে বসবাস করত। সংসারের খরচ চালাতে বিভিন্ন বাড়িতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন আছিয়া খাতুন। রোববার সকালে সন্তানদের বাড়িতে রেখে কাজে যান তিনি। সন্ধ্যায় ফিরে সন্তানদের না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রাও তাদের সন্ধানে নামেন।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাতে বাড়ির পাশের একটি পুকুরে আসিফের মরদেহ ভাসতে দেখা যায়। পরে পুকুরে তল্লাশি চালিয়ে গভীর পানি থেকে উদ্ধার করা হয় সাথী আক্তারের মরদেহ। স্থানীয়দের ধারণা, পুকুরপাড়ের একটি আমগাছ থেকে আম পাড়তে গিয়ে অসাবধানতাবশত পানিতে পড়ে যায় তারা। সাঁতার না জানার কারণে দুজনেই ডুবে মারা যায়।

সোমবার (১ জুন) বেলা ১১টায় জানাজা শেষে স্থানীয় কেকুপাড়া কবরস্থানে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয় ভাই-বোনকে। দুটি ছোট কবরের পাশে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

এদিকে একই দিনে তেঁতুলিয়া উপজেলায় নানিবাড়ি বেড়াতে এসে ডাহুক নদীর পানিতে ডুবে মুন্নাফ (১৪) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। সে বাবার সঙ্গে ঢাকা থেকে ঈদ উদযাপন করতে নানাবাড়িতে এসেছিল।

সোমবার সকালে বন্ধুদের সঙ্গে ডাহুক নদীতে গোসল করতে নামে মুন্নাফ। একপর্যায়ে গভীর পানিতে তলিয়ে যায় সে। সাঁতার না জানায় নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। স্থানীয়রা উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

স্বজনরা জানান, আসন্ন ঈদুল আজহা পরিবারের সঙ্গে আনন্দে কাটানোর স্বপ্ন নিয়ে নানাবাড়িতে এসেছিল মুন্নাফ। কিন্তু সেই ঈদই হয়ে গেল তার জীবনের শেষ ঈদ।

চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মোজাম্মেল হক বলেন, “দুই শিশুর বাবা নেই। তাদের মা অনেক কষ্ট করে সন্তানদের মানুষ করছিলেন। কাজ থেকে ফিরে সন্তানদের খুঁজে না পেয়ে তিনি ভেঙে পড়েছেন। এই শোকের মুহূর্তে পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমাদের নেই।

চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, “শিশু দুটির অকাল মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক। পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

পঞ্চগড় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল ইসলাম জানান, মরদেহের সুরতহাল শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়ের করা হয়েছে।

একদিকে দিনমজুর মায়ের বুক খালি করে চলে গেছে দুই সন্তান, অন্যদিকে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এসে চিরবিদায় নিয়েছে ঢাকার কিশোর মুন্নাফ। তিনটি শিশুর অকাল মৃত্যু যেন তিনটি পরিবারের স্বপ্নকেই মুহূর্তে থামিয়ে দিল।

ঈদ সময়ে  কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এসব হৃদয়বিদারক ঘটনায় শোকে স্তব্ধ পঞ্চগড়বাসী।

 

Link copied!