ফেসবুকে বিদায়বার্তা লিখে ছাত্রলীগ নেতা ও সাংবাদিক রাকিবের আত্মহত্যা

মোঃ নুর নবী , দশমিনা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০১ জুন, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

পটুয়াখালীর দশমিনায় কৃষিপণ্যে ব্যবহৃত বিষাক্ত অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড সেবনের পর রাকিব হোসেন (৩৫) নামে এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি উপজেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি এবং দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার দশমিনা উপজেলা প্রতিনিধি ও যুগান্তর পত্রিকার দশমিনা দক্ষিণ প্রতিনিধি  হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

রোববার সকাল ৬টার দিকে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি আবেগঘন বিদায়বার্তা পোস্ট করেন, যা স্থানীয় জনমনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

ভোররাত ৫টার দিকে দেওয়া ওই পোস্টে রাকিব লিখেন, “একটা মানুষ জীবনে কত যুদ্ধ করতে পারে? যুদ্ধ করতে করতে আজ আমি ক্লান্ত। আপন বলা মানুষগুলো ভালো থাকুক। আফসোস, রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলো আমাকে চিনতে পারল না।

পোস্টে তিনি মৃত্যুর পর মায়ের পাশে দাফন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে নিজের ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব ও আর্থিক হিসাব-নিকাশের বিষয়ে ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌসকে দায়িত্ব দিয়ে পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে কিছু নির্দেশনা দেন। এছাড়া ব্যবসায়িক অংশীদার গৌতম নামের এক ব্যক্তির প্রশংসা করে তাকে কোনো ধরনের হয়রানি না করার আহ্বান জানান।

পোস্টের একপর্যায়ে তিনি লিখেন, “ছোটবেলা থেকেই পরিবার ছাড়া বড় হয়েছি। রক্তের মানুষগুলোর কাছ থেকে কখনো কিছু পাইনি, পেয়েছি শুধু অবহেলা। জীবনে যাদের কাছ থেকে ভালোবাসা পেয়েছি, তাদের সঙ্গে আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। আজ বিদায়ের সময় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।” সবশেষে তিনি সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে লিখেন, “চলার পথে যদি কেউ আমার আচরণে কষ্ট পেয়ে থাকেন, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার গভীর রাতে রাকিব হোসেন চারটি অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড ট্যাবলেট সেবন করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তিনি ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌসকে ফোন দিলে তাকে দ্রুত দশমিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে পথিমধ্যে ভোর ৬টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

রাকিব হোসেনের সহকর্মী ও স্থানীয় সংবাদকর্মী রবিউল হাসান ডব্লিউ জানান, ২০০২ সালে মায়ের মৃত্যুর পর রাকিব নানা বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করেন। কয়েক বছর আগে তিনি উপজেলা সদরে ভাড়া বাসায় একা বসবাস শুরু করেন। বড় বোন রিমঝিম, ভাই রাজীব ও ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও তাকে প্রায়ই হতাশাগ্রস্ত দেখা যেত।

তিনি আরও জানান,রাকিব উপজেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি এবং দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি ছিলেন। সদালাপী ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের কারণে তিনি সবার কাছে প্রিয় ছিলেন এবং কখনো রাজনৈতিক বিরোধের শিকার হননি। পাশাপাশি উপজেলার একটি ওষুধের দোকানেরও মালিক ছিলেন তিনি।

রোববার সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে দশমিনা সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে তার প্রথম নামাজের  অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় এদিকে জানাজায় অংশগ্রহণ করেন সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নূর,ও এম.পি, দশমিনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা, ওসি দশমিনা থানা মো. আতিকুল ইসলাম, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেট্রনিকস মিডিয়ার সাংবাদিকসহ স্থানীয় কয়েক হাজার মানুষ। এর পরে তাকে গলাচিপা উপজেলার চর বিশ্বাস ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সোমবারিয়া বাজার এলাকায় বিকাল ৫ টার পরে দ্বিতীয় নামাজের জানাজাার পরে তার নিজ বারের পারিবারিক কবরস্থানে,মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।

দশমিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. রাহুল বিন হালিম বলেন, “রোববার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা নিয়ে রাকিব হোসেন হাসপাতালে ভর্তি হন। এ সময় তিনি জানান, রাত ৩টার দিকে চারটি অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড ট্যাবলেট সেবন করেছেন।”

তিনি বলেন, “অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড একটি অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক, যা কৃষিপণ্যে ব্যবহার করা হয়। এর একটি ট্যাবলেট সেবন করলেও প্রাণ রক্ষা করা কঠিন। এ বিষের কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষেধক নেই। তাই দ্রুত বরিশালে পাঠানো হলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুর রহমান বলেন, “বিষাক্ত ওষুধ সেবনের ঘটনায় রাকিব হোসেনের মৃত্যুর খবর আমরা পেয়েছি। তবে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়নি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

 

Link copied!