শিক্ষা খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল ফ্যাসিবাদী শাসন: প্রধানমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৭ জুন, ২০২৬, ০৪:১১ পিএম

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন শুধু মানুষের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকারই কেড়ে নেয়নি, শিক্ষা ব্যবস্থাকেও প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিল। তবে এখন সময় ঘুরে দাঁড়ানোর, আর সেই লক্ষ্যেই সরকার দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।

রোববার (৭ জুন) সকালে ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি’ শীর্ষক জাতীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নিজেদের প্রস্তুত করতে না পারলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। তিনি উল্লেখ করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ফরেনসিক বিজ্ঞান, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ডিজিটাল যোগাযোগ, নেতৃত্ব, উপস্থাপন দক্ষতা এবং আর্থিক সচেতনতার মতো বিষয়গুলো আধুনিক শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিটি সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কারণ এর অধিভুক্ত দুই হাজারেরও বেশি কলেজে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।

তারেক রহমান বলেন, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ১৯৯২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রসারের ফলে অনেক প্রচলিত পেশা ঝুঁকির মুখে পড়েছে, আবার নতুন নতুন কর্মক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে। তাই শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, বরং দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

তিনি বলেন, জেনেটিক প্রকৌশল, জীবপ্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানোপ্রযুক্তি, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, শিল্প ইন্টারনেট অব থিংস, ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ প্রযুক্তি এবং পঞ্চম প্রজন্মের বেতার প্রযুক্তির মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষতা অর্জন না করলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা সম্ভব হবে না।

উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের বিষয়টি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলেও অনেকে কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। এর অন্যতম কারণ ব্যবহারিক ও কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি।

এই বাস্তবতা মোকাবিলায় সরকার শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্পখাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তিনি। প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোর বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তুলতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যেই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় ‘সিড ফান্ডিং’ বা উদ্ভাবনী অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, শিক্ষাজীবনেই অর্জিত বাস্তব দক্ষতা তরুণদের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে।

শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ জরুরি হলেও নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একজন প্রকৃত মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং পরিবেশ সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষকদের জ্ঞান, দক্ষতা, সততা ও অঙ্গীকারের ওপরই শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে। তাই শিক্ষকদের শুধু পাঠদান নয়, আদর্শ ব্যক্তিত্ব ও সমাজ পরিবর্তনের পথপ্রদর্শক হিসেবেও ভূমিকা রাখতে হবে।

বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তৃতীয় একটি ভাষা শেখার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, অতিরিক্ত ভাষাগত দক্ষতা দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়িয়ে দেবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন একটি কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা শুধু চাকরি নয়, দক্ষ মানবসম্পদ ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করবে। এই শিক্ষা জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করবে এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

Link copied!