একসময় ফেসবুকের নিউজফিডে ভেসে আসা বিজ্ঞাপন, ব্যবসার প্রচারণা কিংবা বিভিন্ন উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প অন্যদের কাছে হয়তো ছিল সাধারণ কিছু পোস্ট। কিন্তু মো. শাখাওয়াত হোসেনের কাছে সেগুলো ছিল সম্ভাবনার নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত।
স্ক্রিনের ওপারে চলতে থাকা সেই ডিজিটাল জগৎ তাঁকে ভাবিয়ে তুলত - কীভাবে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বদলে দিতে পারে একজন মানুষের জীবন, কীভাবে একটি ছোট উদ্যোগ পৌঁছে যেতে পারে হাজারো মানুষের কাছে। কৌতূহল থেকেই শুরু। আর সেই কৌতূহলই ধীরে ধীরে পরিণত হয় স্বপ্নে, স্বপ্ন থেকে পরিকল্পনায়, আর পরিকল্পনা থেকে বাস্তব উদ্যোগে। বহু বাধা, সংশয় ও সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে আজ তিনি উদ্যোক্তাদের পথপ্রদর্শক হিসেবেও তৈরি করেছেন নিজের আলাদা পরিচয়।
রাজশাহী কলেজ-এর অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাখাওয়াত হোসেন এখন তরুণ উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং সহায়তা দিয়ে কাজ করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘লাইকিং প্লাস’ ইতোমধ্যে শতাধিক উদ্যোক্তার অনলাইন ব্যবসা গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে।
শাখাওয়াত জানান, ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু জানার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। কোনো কিছু দেখলেই সেটি কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা বোঝার চেষ্টা করতেন। সেই কৌতূহলই একসময় তাঁকে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের জগতে নিয়ে আসে।
তাঁর বাস্তব যাত্রার শুরু একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করার সুযোগ থেকে। শুরুতে সাধারণ কাজ হলেও তিনি সেটিকে শেখার সুযোগ হিসেবে নেন। রেস্টুরেন্টটির অনলাইন প্রচারণা, কাস্টমার রিচ ও ডিজিটাল উপস্থিতি নিয়ে কাজ করতে করতেই ডিজিটাল মার্কেটিং সম্পর্কে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
তবে শুরুটা সহজ ছিল না। অনেকেই তাঁকে বলেছিলেন, “এসব বাদ দিয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা করো।” কিন্তু শাখাওয়াত জানতেন, তিনি কোন পথে এগোচ্ছেন। শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “তখন ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে মানুষের ধারণা কম ছিল। উদ্যোক্তাদের বোঝানো, বাজারে বিশ্বাস তৈরি করা -সবকিছুই ছিল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, যে কাজের ভবিষ্যৎ আছে, সেটি শুরুতে সবাই বুঝতে পারে না।”
স্কুলজীবনেই এক কাজিনের সঙ্গে ছোট একটি অনলাইন ব্যবসা শুরু করেন তিনি। তখনই উপলব্ধি করেন, অনলাইনে ব্যবসা সফল করতে শুধু পণ্য নয়, প্রয়োজন ব্র্যান্ডিং, কনটেন্ট, মার্কেটিং ও সঠিক দিকনির্দেশনা। আর সেই বাস্তব প্রয়োজন থেকেই জন্ম নেয় ‘লাইকিং প্লাস’।
বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠান মূলত তরুণ উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করছে। কেউ শিক্ষার্থী, কেউ পড়াশোনার পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগ শুরু করেছেন। তাদের অনলাইনে উপস্থিতি তৈরি, কনটেন্ট পরিকল্পনা, ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণে সহায়তা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
শাখাওয়াত মনে করেন, একজন তরুণ যদি নিজের লক্ষ্য বুঝতে পারে এবং সঠিক গাইডলাইন পায়, তাহলে ই–কমার্স তার জন্য বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি বর্তমানে রাজশাহী কলেজ বিজনেস ক্লাব -এর সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ প্ল্যাটফর্মসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তরুণদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন।
তাঁর প্রতিষ্ঠানকেও তিনি শিক্ষার্থীবান্ধবভাবে সাজিয়েছেন। অফিস পরিচালিত হয় দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত, যাতে শিক্ষার্থীরা সকালে ক্লাস করতে পারে এবং পরে কাজের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন ও আয় করার সুযোগ পায়।
২০১৮ সালে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করা ‘লাইকিং প্লাস’ এখন দুই শতাধিক উদ্যোক্তাকে ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে বলে জানান তিনি। এই পথচলার স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি তিনি ‘স্টার এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড–২০২৫’-এ ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং ক্যাটাগরিতে সম্মাননা অর্জন করেছেন।
তবে এ অর্জনকে তিনি ব্যক্তিগত নয়, দলগত সাফল্য হিসেবেই দেখেন। তাঁর ভাষায়, “এটি শুধু আমার অর্জন নয়, পুরো টিম এবং আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখা উদ্যোক্তাদের অর্জন।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে শাখাওয়াত বলেন, রাজশাহীতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক কম। তাই তিনি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চান, যেখানে তরুণরা পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ শিখবে, আয় করবে এবং নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে পারবে। আমি চাই তরুণরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব দক্ষতা অর্জন করুক। এতে তারা পরিবারকে সহায়তা করতে পারবে, আবার দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারবে।
তরুণদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, “ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে কোনো লাভ নেই। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কাজ শুরু করতে হবে। ছোট সুযোগকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ অনেক সময় ছোট সুযোগই জীবনের বড় পথ তৈরি করে দেয়।”
ফেসবুকের স্ক্রল থেকে সম্ভাবনার যে স্বপ্ন একদিন দেখতে শুরু করেছিলেন শাখাওয়াত, আজ সেটিই ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে বহু তরুণের নতুন পথচলার প্রেরণায়।
আপনার মতামত লিখুন :