দুর্নীতির মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ১২ জুন দুবাই পুলিশ তাকে আটক করে। পরে ১৪ জুন জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে মামলার নথি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র প্রস্তুত করেছে। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে তার প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে।
তবে গ্রেপ্তার হওয়া আর দেশে ফিরিয়ে আনা—এই দুই প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের মাধ্যমে কাউকে শনাক্ত বা আটক করা তুলনামূলক সহজ হলেও প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া দীর্ঘ, জটিল এবং নানা আইনি শর্তের ওপর নির্ভরশীল।
সবচেয়ে বড় বাধা হলো, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সরাসরি কোনো অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। ফলে বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি মূলত দুই দেশের কূটনৈতিক সমঝোতা এবং আমিরাতের আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ‘ডুয়াল ক্রিমিন্যালিটি’ও বিবেচনায় আসবে। অর্থাৎ, বেনজীরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো বাংলাদেশ ও আমিরাত—উভয় দেশের আইনেই দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত হতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বেনজীর আহমেদ তার পক্ষে শক্তিশালী আইনজীবী নিয়োগ করে মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা প্রতিহিংসামূলক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারেন। যদি আমিরাতের আদালত অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করে, তাহলে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এছাড়া অতীতের অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের জন্য খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খান কিংবা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানকে এখনো দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। একাধিক পাসপোর্ট বা নাগরিকত্বসংক্রান্ত জটিলতা এসব ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রেও এমন কোনো জটিলতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইন্টারপোলের তালিকাভুক্ত বহু বাংলাদেশিকে এখনো দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তবে সফলতার নজিরও রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হত্যা মামলার আসামি মহসিন মিয়াকে ইন্টারপোলের সহায়তায় সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল বাংলাদেশ।
ফলে বেনজীর আহমেদের প্রত্যর্পণ এখন শুধু আইনি লড়াই নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষাও। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিখুঁত আইনি নথিপত্র প্রস্তুত করা এবং কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আপনার মতামত লিখুন :