বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ২০১৫ সালে ছাত্রদল নেতা টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লার কথিত ‘ক্রসফায়ার’ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্ফোরক জবানবন্দি দিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা অসীম কুমার সিকদার। তিনি দাবি করেছেন, ওই দুই নেতাকে ক্রসফায়ারে হত্যার জন্য তাকে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এহসান উল্লাহ। তবে তিনি সেই নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিলেন, চাকরি ছেড়ে দিতে রাজি আছেন, কিন্তু এমন কাজ করবেন না।
বুধবার (১৭ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলের সামনে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
মামলায় মোট চারজন আসামি রয়েছেন। তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিন। অপর দুই আসামি—বরিশাল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং তৎকালীন এসপি এহসান উল্লাহ—পলাতক রয়েছেন।
বর্তমানে বরিশাল সদর নৌ-থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ৪৮ বছর বয়সী অসীম কুমার সিকদার ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৫ সালের মে পর্যন্ত আগৈলঝাড়া থানায় এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
জবানবন্দিতে তিনি জানান, ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে আগৈলঝাড়ার বুধার বাইপাস এলাকায় একটি ফলবাহী পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়ার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান। স্থানীয়দের সহায়তায় আগুন নেভানোর পর কোনো অভিযোগকারী পাওয়া যায়নি। পরে থানায় ফিরে গেলে তৎকালীন ওসি মনিরুল ইসলাম তাকে বাদী করে একটি মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন। অসীম কুমারের দাবি, এসপি এহসান উল্লাহর নির্দেশে প্রস্তুত করা একটি এজাহারে তাকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয় এবং সেই এজাহারের ভিত্তিতে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়।
তিনি বলেন, মামলার পর আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীতে ২০ ফেব্রুয়ারি এসপি আগৈলঝাড়া থানায় এসে তাকে ডেকে বলেন, ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামিকে ‘ক্রসফায়ার’ দিতে হবে এবং সেই দায়িত্ব তাকে পালন করতে হবে।
অসীম কুমার আদালতকে জানান, তিনি তখন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি চাকরি ছেড়ে দিতে রাজি আছি, কিন্তু এই কাজ করতে পারব না।” এতে ক্ষুব্ধ হয়ে এসপি তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং চাকরি ও পদোন্নতিতে ক্ষতির হুমকি দেন।
সাক্ষ্যে তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের খবর আগে থেকেই জানতেন এবং এসব ঘটনায় তার তীব্র আপত্তি ছিল। সে কারণেই তিনি ওই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান। পরে জানতে পারেন, আগৈলঝাড়া থানার অন্যান্য কর্মকর্তাদের কাছেও একই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারাও রাজি হননি।
অসীম কুমার জানান, ২১ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পান এবং দূরে আগুনের মতো কিছু দেখতে পান। পরদিন সকালে ওসির কাছ থেকে জানতে পারেন যে, ছাত্রদল নেতা টিপু হাওলাদার ও জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার নেতা কবির মোল্লা ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়েছেন।
তার দাবি, আগৈলঝাড়া থানার কোনো কর্মকর্তা এ কাজে রাজি না হওয়ায় উজিরপুর থানা থেকে এএসআই মাহাবুল ইসলাম ও এএসআই জসিম উদ্দিনকে এনে অভিযানে যুক্ত করা হয়। পরে নিহতদের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয় এবং ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এদিন মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার। সাক্ষ্যগ্রহণকালে শুনানি পরিচালনা করেন প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম।
আপনার মতামত লিখুন :