রংপুরে ভিসা জালিয়াতি চক্রের ৩ সদস্য আটক, বেরিয়ে এলো প্রতারণার ভয়ংকর কৌশল

মোঃ বেলায়েত হোসেন বাবু , ব্যুরো প্রধান রংপুর

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম

রংপুর মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের বিশেষ অভিযানে ভিসা জালিয়াতি ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের তিন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ জাল ডকুমেন্ট, দেশি-বিদেশি পাসপোর্ট, ভূয়া ভিসা, ভুয়া অফার লেটার, অর্থ আদায়ের রশিদ এবং অন্যান্য প্রতারণার সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুর আড়াইটার দিকে নগরীর তাজহাট থানাধীন কলেজপাড়া এলাকার সিডিটি হাউজিং সোসাইটির একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ।

‎পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদের নির্দেশনা এবং গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অভিযানে চক্রটির সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। আটককৃতরা হলেন,রংপুর মহানগরের হাজিরহাট এলাকার রুহানুর রহমান (২৩), নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার খাতা মধুপুর এলাকার শফিক ইসলাম (৩১) এবং কিশোরগঞ্জ উপজেলার ঘোনপাড়া (বেলতলী বাজার) এলাকার হিমেল ইসলাম (২২)। ‎অভিযানে তাদের কাছ থেকে ১০টি বাংলাদেশি অরিজিনাল পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়, যেগুলোতে ভূয়া অস্ট্রেলিয়ান ভিসা সংযুক্ত ছিল।

এছাড়া দুটি জাল অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্ট, একটি স্টেইনলেস স্টিলের টেবিল নেমপ্লেট, চারটি নেম ট্যাগ, অস্ট্রেলিয়ার কোস্টা গ্রুপের ডিরেক্টর অ্যাডমিন পরিচয়ে তৈরি একটি ভুয়া আইডি কার্ড, কোস্টা গ্রুপের নাম ও লোগো সংবলিত দুটি প্যানাফ্লেক্স ব্যানার, একটি ল্যাপটপ, চারটি মোবাইল ফোন এবং প্রায় ৩০ সেট ভুয়া অফার লেটার, ভিসা ডকুমেন্ট, অর্থ আদায়ের রশিদ ও বিমান টিকিট উদ্ধার করা হয়। এসব কাগজপত্র ভিএফএস গ্লোবালের নামে ব্যবহৃত খামে সংরক্ষিত ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। ‎

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা স্বীকার করেছেন যে, তারা সংঘবদ্ধভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অস্ট্রেলিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া পেজ খুলে বিদেশগামী চাকরিপ্রত্যাশীদের টার্গেট করতেন। বিশেষ করে বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখা তরুণ-যুবক ও প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ফাঁদে ফেলতেন। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য তারা নিজেদের অফিসে প্রতিষ্ঠানের লোগোসংবলিত ব্যানার, নেমপ্লেট ও পরিচয়পত্র ব্যবহার করতেন। আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে তাতে জাল ভিসা সংযুক্ত করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতেন। পরে ভুক্তভোগীরা প্রতারণার শিকার হয়েছেন বুঝতে পারলেও অনেক ক্ষেত্রে আইনি সহায়তা নিতে পারেননি।

পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া পাসপোর্টগুলোর মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, তারা অস্ট্রেলিয়ার ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য বিভিন্ন দালাল ও এজেন্টের মাধ্যমে পাসপোর্ট জমা দিয়েছিলেন। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল। ‎এ বিষয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে একটি সক্রিয় ভিসা জালিয়াত চক্রের তিন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ জাল কাগজপত্র ও প্রতারণার আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে প্রতারণার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে এবং চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিদেশে চাকরি বা অভিবাসনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে অনুমোদিত এজেন্সি ও সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে কেউ প্রতারকদের ফাঁদে পা না দেন। ঘটনায় আটক তিনজনের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

Link copied!