মোঃ জাহাঙ্গীর আলম: মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার জিয়ানপুর ইউনিয়নের বড়টিয়া গ্রামে কালীগঙ্গা নদীর ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে ঐতিহ্যবাহী ৮৩ নং বড়টিয়া বি ডি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং প্রায় তিন শতাধিক মেহনতি মানুষের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভাঙনের তীব্রতা বাড়ায় চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শনিবার (২৭ জুন) ভাঙনকবলিত কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বিদ্যালয়ের প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী এবং এলাকার কয়েকশ মানুষ দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষকগণ, শিক্ষার্থী ও ভুক্তভোগীসহ ৩০০-র বেশি সাধারণ মানুষের কণ্ঠে "আমাদের একটাই স্লোগান, নদীভাঙন রক্ষা চাই" স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে।
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ইতিমধ্যে একাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। ভাঙন যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো মুহূর্তে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্কুল ভবন, ফসলি জমি ও অবশিষ্ট ৩০০ পরিবারের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও বিলীন হয়ে যাবে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নার্গিস পারভীন জানান, 'বিদ্যালয়টি রক্ষার জন্য গত ২০২৫ সালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত আবেদন করা হয়েছিল। তখন নদী থেকে স্কুলটি ৩০০ গজ দূরে ছিল। সে সময় জিও ব্যাগ এলেও তা আর ফেলা হয়নি। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৫ জুন পুনরায় ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রতিদিন নদী যেভাবে এগিয়ে আসছে, তাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বাড়ছে।'
বড়টিয়া গ্রামের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল আলিম এবং সাবেক মেম্বার খোরশেদ আলমসহ স্থানীয় ৩০০-র বেশি বাসিন্দা এই মানববন্ধনে অংশ নেন। সাবেক মেম্বার খোরশেদ আলম বলেন, 'শত শত মেহনতি মানুষের শেষ সম্বল ও এই এলাকার শিশুদের শিক্ষার একমাত্র আলো ছড়ানোর প্রতিষ্ঠানটি বাঁচাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা দরকার। প্রশাসন যদি এখনই ব্যবস্থা না নেয়, তবে আমরা আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ও মানববন্ধনের ডাক দিতে বাধ্য হব।'
এ বিষয়ে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাদের দায়িত্বে অবহেলা ও উদাসীনতার চিত্র ফুটে ওঠে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আখতারুজ্জামানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'আমি হাসপাতালে আছি, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি)-কে ফোন করেন।'
পরবর্তীতে উপ-বিভাগীয় সহকারী প্রকৌশলী আশরাফুল সিদ্দিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, 'গত বছর ওই এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার দায়িত্বে আমি ছিলাম, এবার দায়িত্বে আছেন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) বিল্লাল সাহেব। উনাকে ফোন দিন।' তবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসডি বিল্লালকে ফোন করা হলে তিনি তার দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে মানিকগঞ্জ ১ আসনের সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের দিকে ইঙ্গিত করেন।
সচেতন মহলের মতে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় (এসডি) পদাধিকারী কর্মকর্তার জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা উচিত। অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যেমন জিওব্যাগ, বালুভর্তি বস্তা, সিসি ব্লক বা ডাম্পিং করে তাৎক্ষণিক ভাঙন রোধের চেষ্টা করা। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং করে নতুন ভাঙনের পূর্বাভাস ও দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের আইনগত দায়িত্বের মধ্যেই নদীতীর সংরক্ষণ, নদী ভাঙন প্রতিরোধ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে এমপির ডিও লেটারের উপর দায় চাপানো হচ্ছে।
'কিন্তু এলাকার মানুষের ভাষ্যে উঠে আসে, আজ ব্যবস্থা নিলে স্কুল ও শত শত পরিবারের বসতভিটা রক্ষা পাবে, কাল হয়তো আর ডিও লেটারের সেই সুযোগ থাকবে না'— চরম অসহায়ত্ব নিয়ে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমনটাই বলছিলেন ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ।
বিপন্ন বড়টিয়া গ্রাম ও একমাত্র বিদ্যাপীঠটিকে কালীগঙ্গার গ্রাস থেকে বাঁচাতে জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জরুরি ও টেকসই হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী জনসাধারণ।
আপনার মতামত লিখুন :