স্বামীকে হত্যা করে মরদেহ ছয় খণ্ডে বিভক্ত করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় প্রথম স্ত্রী ফাতেমা বেগম ওরফে শিল্পীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে মরদেহ গোপনের অপরাধে তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ঢাকার ষোড়শ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ নাজমুন নাহার নিপু এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত ফাতেমাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে সাজা পরোয়ানা জারি করে তাকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি খন্দকার শফি নেওয়াজ নাসির জানান, স্বামী হত্যার অপরাধে ফাতেমাকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মরদেহ গোপনের দায়েও পৃথক সাজা দেওয়া হয়েছে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২১ সালের ৩০ মে রাতে রাজধানীর মহাখালীর আমতলী এলাকায় একটি পানির ড্রামের ভেতর থেকে এক ব্যক্তির মাথাবিহীন দেহ উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ। একই রাতে মহাখালী বাস টার্মিনালের এনা পরিবহনের কাউন্টারের সামনে একটি ব্যাগের ভেতর থেকে উরু থেকে বিচ্ছিন্ন দুই পা এবং কাঁধ থেকে বিচ্ছিন্ন দুই হাত উদ্ধার করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে মরদেহের মোট ছয়টি খণ্ড উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগ তদন্ত শুরু করে। মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই নিহত ময়না মিয়ার প্রথম স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তে ফাতেমা জানান, পারিবারিক বিরোধ, অর্থ ভাগাভাগি এবং স্বামীর একাধিক বিয়েকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি অটোরিকশাচালক স্বামী ময়না মিয়াকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করেন। পরে গলা কেটে হত্যা করে মরদেহ ছয় খণ্ডে বিভক্ত করেন।
এরপর মাথা একটি লাল কাপড়ের ব্যাগে, দেহের মূল অংশ একটি নীল পানির ড্রামে এবং দুই হাত ও দুই পা আরেকটি বড় কাপড়ের ব্যাগে ভরে রাখেন। পরে এক হাজার ৩০০ টাকা ভাড়ায় একটি রিকশা নিয়ে প্রথমে আমতলী এলাকায় দেহের মূল অংশ ফেলে দেন। এরপর মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে হাত-পা ভর্তি ব্যাগ রেখে আসেন। সবশেষে মাথাভর্তি ব্যাগটি বনানী ১১ নম্বর সেতুর পূর্ব পাশ থেকে গুলশান লেকে ফেলে দিয়ে বাসায় ফিরে যান।
এ ঘটনায় নিহতের দ্বিতীয় স্ত্রী নাসরিন ২০২১ সালের ১ জুন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। গ্রেপ্তারের পর ফাতেমা আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার তদন্ত দলের পরিদর্শক কাজী শরীফুল ইসলাম ফাতেমাকে একমাত্র আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেন। ২০২৩ সালের ১২ মার্চ আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন।
বিচার চলাকালে ২৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনে ফাতেমা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন এবং নিজের পক্ষে নিজেই সাক্ষ্য দেন। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত বৃহস্পতিবার এই রায় ঘোষণা করেন।
আপনার মতামত লিখুন :