যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক সংঘাত ক্রমেই পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত হোদাইদাহ বন্দরনগরীতে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। সৌদি জোটকে এর জন্য মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুথি নিয়ন্ত্রিত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
শনিবার (২৫ জুলাই) কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
ইয়েমেনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, শুক্রবার গভীর রাতে পরিচালিত এই সামরিক অভিযান রিয়াদের জন্য চরম পরিণতি ডেকে আনবে এবং এর কড়া ও উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়েছে, হোদাইদাহকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর মাধ্যমে সৌদি সরকার সংঘাতের নতুন ধাপে ‘উত্তেজনার বিপরীতে সমান বা অধিক উত্তেজনা’ সৃষ্টির পথ খুলে দিয়েছে।
হুথি-সমর্থিত গণমাধ্যম ‘আল মাসিরাহ টিভি’ জানায়, বিমান হামলাগুলো মূলত স্থানীয় টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। এ ছাড়া কামারান দ্বীপে চালানো হামলায় অন্তত এক নারী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, কৌশলগত হোদাইদাহ বন্দরেও একাধিক বিকট বিস্ফোরণ ঘটেছে। তবে ইয়েমেনে মোতায়েন করা সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট বন্দরটিতে সুনির্দিষ্ট আক্রমণের কথা অস্বীকার করেছে।
উল্লেখ্য, লোহিত সাগরের তীরবর্তী হোদাইদাহ বন্দরটি হুথি-নিয়ন্ত্রিত উত্তর ইয়েমেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লাইফলাইন। দেশটির এই অঞ্চলটিতে অধিকাংশ বাণিজ্যিক পণ্য ও আন্তর্জাতিক সাহায্য-সহযোগিতা এ বন্দর দিয়েই প্রবেশ করে থাকে।
অন্যদিকে, পরিস্থিতির অবনতির জন্য হুথি গোষ্ঠীকেই দায়ী করেছেন ইয়েমেনে সৌদি জোটের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি। লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের ধারাবাহিক আক্রমণকে তিনি ‘কাপুরুষোচিত ও বেপরোয়া’ বলে অভিহিত করেন।
এক বিবৃতিতে জেনারেল আল-মালিকি জানান, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট প্রয়োজনীয় সকল সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রাখবে। হুথিরা যদি অবিলম্বে তাদের শত্রুতামূলক তৎপরতা বন্ধ না করে, তবে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত বুধবার লোহিত সাগরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে কয়েকটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা চালায় হুথিরা, যার ফলে অন্তত একটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হুথিদের দাবি, তাদের ঘোষিত সমুদ্রপথের অবরোধ লঙ্ঘন করায় ওই জাহাজগুলোতে হামলা চালানো হয়েছিল।
উল্লেখ্য, গত ২০ জুলাই থেকে এই নৌপথে কঠোর অবরোধ আরোপ করে হুথি গোষ্ঠী। তার এক সপ্তাহ আগে সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রক্তক্ষয়ী হামলার প্রেক্ষাপটে তারা এই সিদ্ধান্ত নেয়। সানা বিমানবন্দর আক্রমণের জন্য তারা প্রথম থেকেই সৌদি আরবকে দায়ী করে আসছে।
তবে ইয়েমেনের রিয়াদ সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার বিমানবন্দর হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করে— একটি ইরানি বিমান অননুমোদিতভাবে অবতরণ করার চেষ্টায় তারা এই পদক্ষেপে বাধ্য হয়েছিল।
সানায় হামলার পরপরই হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝো হওয়া অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে যে ‘উত্তেজনা প্রশমন পর্ব’ চলছিল, ওই আক্রমণের মধ্য দিয়ে কার্যত তার সমাপ্তি ঘটল।

আপনার মতামত লিখুন :