ময়মনসিংহে স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধে হত্যার দায়ে দ্বিতীয় স্ত্রী আফরোজা শেখ ইতিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) ময়মনসিংহের বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক ফারহানা ফেরদৌস আসামির উপস্থিতিতে এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে (পিপি) আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. আকরাম হোসেন এবং আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাজ্জাদুর রহমান। বিচারিক কার্যক্রমে মোট ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ, আলামত ও উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত এ রায় প্রদান করেন।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপক্ষ দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে আসামি আফরোজা শেখ ইতিকে ওই ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাকে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫-এ ধারা অনুযায়ী বিচার চলাকালে হাজতে থাকা সময় তার সাজার মেয়াদ থেকে সমন্বয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহ নগরীর বাঁশবাড়ি কলোনি এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম সপু প্রথমে মাহমুদা আক্তার কুমুকে বিয়ে করেন। ওই দম্পতির একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। পরবর্তী সময় তিনি আফরোজা শেখ ইতিকে দ্বিতীয় বিয়ে করলে দুই স্ত্রীকে কেন্দ্র করে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও দাম্পত্য কলহ চলতে থাকে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, প্রথম স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় স্ত্রী আফরোজা শেখ ইতি প্রায়ই শফিকুল ইসলাম সপুকে হুমকি ও মানসিক নির্যাতন করতেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০১৯ সালের ১০ জুন সন্ধ্যা থেকে ১৩ জুনের মধ্যে কোনো একসময় আফরোজা শেখ ইতি, তার ভাই দীন ইসলাম এবং অজ্ঞাতনামা কয়েকজন সহযোগী পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধে শফিকুল ইসলাম সপুকে হত্যা করেন।
হত্যার পর ঘটনাটি গোপন করার উদ্দেশ্যে মরদেহ নগরীর আকুয়া এলাকার একটি পচা পুকুরে কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। ২০১৯ সালের ১৩ জুন স্থানীয় লোকজন পুকুরে একটি মানুষের হাত ভেসে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কচুরিপানার নিচ থেকে অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
মামলার বাদী ও নিহতের মা নুরুন্নাহার অভিযোগ করেন, হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আফরোজা শেখ ইতি এর আগে কোতোয়ালি মডেল থানায় স্বামী নিখোঁজ দাবি করে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। তার দাবি, এটি ছিল হত্যার ঘটনা আড়াল করার একটি পরিকল্পিত কৌশল।
তবে আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট নন নুরুন্নাহার। রায় ঘোষণার পর তিনি বলেন, তিনি আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করেছিলেন।
রায়ে আদালত আরও উল্লেখ করেন, একই ঘটনায় যেহেতু আসামিকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাই দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় পৃথক কোনো সাজা দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া আদালত নির্দেশ দেন, আদায়কৃত জরিমানার অর্থ থেকে মামলার পরিচালনা ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে অবশিষ্ট ৫০ হাজার টাকা ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪৫ (১) (বি) ধারা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ হিসেবে মামলার বাদী নুরুন্নাহারকে প্রদান করতে হবে।
ময়মনসিংহ আদালতের পরিদর্শক পিএসএম মোস্তাছিনুর রহমান বলেন, রায় ঘোষণার পর আদালত আসামির বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করেন এবং তাকে সাজা ভোগের জন্য ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আপনার মতামত লিখুন :