ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় চাঞ্চল্যকর শিশু নিছামনি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে, যা ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারের কাছে প্রদান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মামলার এক অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে ময়মনসিংহের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল পৃথকভাবে এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আরিফ, রাকিব ও সিয়ামকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সুদীপ্তা সরকার এ রায় ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, মামলার অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামি মারুফকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় আরও আড়াই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মেছবাহ উদ্দিন আহমেদ এ রায় ঘোষণা করেন। আদালত নির্দেশ দেন, দুটি সাজা একসঙ্গে কার্যকর হবে। মারুফ প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকবে, পরে তাকে সাধারণ কারাগারে স্থানান্তর করা হবে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৪ জুন বিকেলে ধোবাউড়ায় শিশু নিছামনিকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের পর নদীতে ফেলে হত্যা করা হয়। পরদিন ১৫ জুন নিহত শিশুর বাবা ধোবাউড়া থানায় মামলা দায়ের করেন। ঘটনার পরপরই পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। মাত্র ৯ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ২৩ জুন চার আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে ধোবাউড়া থানা পুলিশ। এরপর অভিযোগপত্র দাখিলের মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে বিচার কার্যক্রম শেষ হয়। অর্থাৎ ঘটনার মাত্র ২৫ দিনের মাথায় আদালত রায় ঘোষণা করেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এত স্বল্প সময়ে তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল ও বিচার সম্পন্ন হওয়ার ঘটনা দেশের বিচারিক ইতিহাসে বিরল।
মামলাটি শুরু থেকেই নিবিড়ভাবে তদারকি করেন ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান। তদন্ত কার্যক্রম, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও আদালতে উপস্থাপনের প্রতিটি ধাপ তিনি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন, যার ফলে দ্রুত বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
রায় ঘোষণার পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান প্রতিদিনের কাগজ-কে বলেন,“মামলাটি আমি ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করেছি। তদন্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করায় বিচার বিভাগের মাননীয় বিচারকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে পুলিশের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”
মোমেনশাহী ডিএস কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. মো. ইদ্রিস খান বলেন,“এত অল্প সময়ের মধ্যে একটি হত্যা মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হতে আমি এই প্রথম দেখলাম। এ মামলায় ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে, দেশের বিচারিক ইতিহাসে দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করতে পুলিশের এমন সমন্বিত ভূমিকা একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে ময়মনসিংহের বিচার বিভাগ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। এ জন্য ময়মনসিংহবাসীর পক্ষ থেকে বিচার বিভাগ ও জেলা পুলিশকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।”
আপনার মতামত লিখুন :