দারিদ্র্য তাদের থামাতে পারেনি। কেউ হারিয়েছে বাবাকে, কেউ বর্ষায় জলাবদ্ধ পথ পেরিয়ে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে গেছে, আবার কেউ প্রতিদিন ২০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ক্লাস করেছে। অভাবের সংসারে কখনো না খেয়ে, কখনো অর্ধাহারে থেকেও তারা বই-খাতা ছাড়েনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর মেধার জোরে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে যশোরের কেশবপুর ও মনিরামপুরের তিন শিক্ষার্থী অভিজিৎ রায়, তানিয়া নাসরিন ও সুমি খাতুন।
তাদের সবার স্বপ্ন এক উচ্চশিক্ষা নিয়ে একদিন চিকিৎসক হওয়া। কিন্তু এসএসসির ফল প্রকাশের আনন্দের মধ্যেই সামনে এসেছে কঠিন বাস্তবতা। পরিবারের চরম অর্থসংকটে ভালো কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। মেধার জোরে এসএসসির বৈতরণী পেরোলেও এখন তাদের স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ। বাবাকে হারিয়েও থামেনি অভিজিৎ
কেশবপুরের গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিজিৎ রায় অর্জন করেছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার বাবা অশোক রায়। এরপর বিধবা মা স্বপ্না রায়ের কষ্টের সংসারেই বড় হতে থাকে অভিজিৎ। অভাবের সংসারে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মা ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি। অভিজিৎও হাল ছাড়েনি। দিনের পর দিন কষ্ট করে পড়াশোনা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত এসএসসিতে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে সে।
অভিজিৎ বলে, বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে ডাক্তার বানানোর। শিক্ষক সেলিম স্যার ও শাহানাজ পারভীন ম্যাডামের নির্দেশনায় এতদূর আসতে পেরেছি। এখন সহযোগিতা পেলে পড়াশোনা চালিয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। অভিজিৎয়ের মা স্বপ্না রায় বলেন, অভাবের সংসারে কখনো অনাহারে, কখনো অর্ধাহারে থেকেও ছেলে পড়াশোনা থেকে পিছপা হয়নি। শত বাধা পেরিয়ে সে ভালো ফল করেছে। কিন্তু এখন তাকে ভালো কলেজে পড়ানোর মতো সামর্থ্য আমার নেই। তার বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে ডাক্তার বানাবেন। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
জলাবদ্ধতা ডিঙিয়ে তানিয়ার জিপিএ-৫ কেশবপুরের গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে ভ্যানচালক আবুল হোসেনের মেয়ে তানিয়া নাসরিন। তার বাড়ি জলাবদ্ধ ব্যাসডাঙ্গা গ্রামে। বছরের প্রায় ছয় মাস জলাবদ্ধতার কারণে বর্ষাকালে স্কুলে যাওয়া ছিল তার জন্য রীতিমতো সংগ্রাম। পানি ডিঙিয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যেত তানিয়া। সংসারে অভাব থাকায় অনেক সময় ঠিকমতো খাবারও জুটত না। তবু কোনো বাধাই তার স্কুলে যাওয়া ও পড়াশোনার পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
তানিয়া বলে, আমার ফলাফলে গ্রামবাসী আনন্দিত। কিন্তু ভ্যানচালক বাবার পক্ষে ভালো কলেজে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। অন্যের সহায়তা ছাড়া ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব নয়। তানিয়ার মা ফরিদা বেগম বলেন, মেয়েটার মুখে ঠিকমতো খাবার দিতে পারিনি। তারপরও পড়া চালিয়ে গেছে। একটি দিনের জন্যও স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেনি। স্কুলের স্যাররা মেয়েটাকে পড়াশোনায় সাহায্য করেছেন। এখন কিভাবে মেয়েকে পড়াব, তা জানি না।
গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুপ্রভাত কুমার বসু বলেন, তানিয়া আমাদের প্রতিষ্ঠানের গর্ব। স্কুল থেকে সাধ্যমতো তাকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। এ কারণে আমরাও তার উচ্চশিক্ষা নিয়ে চিন্তিত। সমাজের দানশীল ও বিত্তবানরা এগিয়ে এলে এই অদম্য মেধাবী একদিন ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবায় এগিয়ে আসতে পারবে।
২০ কিলোমিটার হেঁটে স্কুল, সুমিরও স্বপ্ন ডাক্তার হওয়ার মনিরামপুর উপজেলার বাঙালীপুর গ্রামের দিনমজুর আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সুমি খাতুন। পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতেই যেখানে বাবাকে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। যাতায়াতের জন্য সাইকেল কেনা কিংবা প্রতিদিন ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। তাই প্রতিদিন ১০ কিলোমিটার যাওয়া এবং ১০ কিলোমিটার আসা মোট ২০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটেই স্কুলে যাতায়াত করত সুমি।
নানা মারা যাওয়ার পরও পারিবারিক ও আর্থিক প্রতিকূলতা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু সুমি পড়াশোনা ছাড়েনি। কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করেই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে। সুমির এখন একটাই চিন্তা কলেজে ভর্তি ও পরবর্তী পড়াশোনার খরচ কীভাবে চলবে। দিনমজুর বাবার সীমিত আয়ে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা কতটা সম্ভব, সেটিই এখন তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।
মেধা যেন অর্থের কাছে হার না মানে কেশবপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার শেখ ফিরোজ আহমেদ বলেন, কেশবপুরের গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভিজিৎ রায় ও গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের তানিয়া নাসরিনের অদম্য সাফল্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়। চরম অনটন ও পিতৃহীনতার মতো কঠিন বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে তাদের এই অর্জন অদম্য মেধা ও অধ্যবসায়ের প্রমাণ।
তিনি বলেন, কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা যেন অর্থের অভাবে থমকে না যায়, সে বিষয়ে আমরা সচেতন। শিক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে সরকারি উপবৃত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও এই মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি। কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) কাজী মো. মেশকাতুল ইসলাম বলেন, প্রতিকূল পরিবেশ জয় করা কেশবপুরের এসব অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের আন্তরিক শুভকামনা জানাই।
তিনি বলেন, “অর্থাভাবের কারণে এই মেধার প্রদীপ নিভে যেতে দেওয়া হবে না। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিজিৎ রায় ও তানিয়া নাসরিনসহ এসব অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি ও পড়াশোনা সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও আনুষঙ্গিক সহায়তা প্রদান করা হবে। সমাজের দানশীল ব্যক্তিরাও তাদের চিকিৎসাবিদ হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসবেন বলে আশা করি।
এসএসসির ফলাফলে তিন শিক্ষার্থীর সাফল্য এখন শুধু তাদের পরিবারের আনন্দের কারণ নয়; এটি অভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করা অসংখ্য শিক্ষার্থীর জন্যও অনুপ্রেরণা। তবে তাদের সামনে এখন আরও বড় লড়াই উচ্চমাধ্যমিক ও পরবর্তী শিক্ষাজীবনের ব্যয় মেটানো। যথাসময়ে সরকারি ও সামাজিক সহায়তা মিললে দারিদ্র্যকে জয় করে উঠে আসা এই তিন মেধাবীর স্বপ্ন হয়তো একদিন বাস্তব হবে। তাদের হাতেই হয়তো ভবিষ্যতে লেখা হবে মানুষের সেবায় নিয়োজিত তিন চিকিৎসকের গল্প।

আপনার মতামত লিখুন :