আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পরই ক্লোজ, পরে বরখাস্ত ডিআইজি নাজমুল করিম খান

মোঃ কামরুল ইসলাম , গাজীপুর মহানগর সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পরই ক্লোজ, পরে বরখাস্ত ডিআইজি নাজমুল করিম খান

ফাইল ফটো

গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার ডিআইজি ড. মো. নাজমুল করিম খানকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দফতরে রিপোর্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দফতরের এক আদেশে তাকে গাজীপুরের পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে ২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় সদর দফতরে রিপোর্ট করতে বলা হয়। বিষয়টি একাধিক সংবাদমাধ্যমও নিশ্চিত করেছে।

তবে তাকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে নানা আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকাশ্যে যাতায়াতের সময় সড়ক ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এলেও এর বাইরে আরও কিছু বিষয় তার অপসারণের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করার পর এক মহলের সঙ্গে তার বিরোধ, রাজনৈতিক পরিচয় এবং গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালে অপরাধ দমনে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এসব দাবির স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই করা যায়নি।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জিএমপি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কমিশনার ও অতিরিক্ত কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ঢাকায় থেকে কর্মস্থলে যাতায়াত করে আসছেন। সরকারি আবাসন সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে এ ধরনের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে বলেও তাদের দাবি। তাদের প্রশ্ন, একই ধরনের যাতায়াত ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলে এলেও নাজমুল করিম খান দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাস পর কেন বিষয়টি বড় করে সামনে এলো।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে যাতায়াতের অভিযোগ নিয়ে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। এর আগে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এ বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এরপরই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সদর দফতরে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত আসে।

অন্যদিকে নাজমুল করিম খানের দায়িত্ব পালনকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জিএমপির বিভিন্ন অভিযানের কথাও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ছিনতাই ও মাদকবিরোধী অভিযান, পোশাকশিল্প এলাকায় অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ছিলেন।

গতবছর গাজীপুরে দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুত সময়ের মধ্যে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। পুলিশের পক্ষ থেকে ওই মামলায় তদন্ত ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি গাছা এলাকায় ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার, অস্ত্র ও অর্থ উদ্ধারের মতো অভিযান এবং একটি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতিও জিএমপির কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সামনে আসে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, মাঠপর্যায়ে কোনো কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কারণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাজের প্রভাব, বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সাম্প্রতিক বিতর্ক—সবকিছুই বিবেচনায় আসতে পারে। তবে নাজমুল করিম খানের ক্ষেত্রে এসব কারণের কোনটি কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা স্পষ্ট নয়।

বাধ্যতামূলক অবসর থেকে পুনর্বহাল

ড. মো. নাজমুল করিম খান বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা। প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হন। এরপর ডিআইজি পদে পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ স্টাফ কলেজে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি নথিতেও ২০২৫ সালের নভেম্বরে তার ডিআইজি হিসেবে যোগদানের প্রজ্ঞাপনের তথ্য পাওয়া যায়।

২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর তিনি গাজীপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন। প্রায় ১০ মাস দায়িত্ব পালনের পর তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দফতরে রিপোর্ট করতে বলা হয়।

নাজমুল করিম খান জাপান থেকে কৃষিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন বলেও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

আদেশে যা বলা হয়েছে

পুলিশ সদর দফতরের আদেশে গাজীপুরের পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে নাজমুল করিম খানকে ঢাকায় পুলিশ সদর দফতরে রিপোর্ট করতে বলা হয়। তবে আদেশে তাকে সরিয়ে দেওয়ার বিস্তারিত কারণ উল্লেখ করা হয়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে।

সিয়াম সরিষা
Link copied!