সিডরের ১৮ বছর পরও দগদগে ক্ষত: বিষখালীর সেই দিনের স্মৃতি ভুলতে পারেনি উপকূলবাসী

মোঃ মাহমুদুল হাসান , পাথরঘাটা (বরগুনা) সংবাদাতা

প্রকাশিত: ১৬ নভেম্বর, ২০২৫, ০৮:১৬ পিএম

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর—বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের মানুষের জীবনে এক দুঃস্বপ্নের নাম সিডর। সেই ভয়াল রাতের স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে বরগুনা, পাথরঘাটা, বামনা, মঠবাড়িয়া, আমতলীসহ বিষখালী নদী উপকূলের মানুষের জীবনকে। আজ সিডর দিবসে শোক, স্মরণ ও পুনর্গঠনের প্রত্যয় নিয়ে দিনটি পালন করছে উপকূলবাসী। সেদিন গভীর রাতে ঘূর্ণিঝড় সিডর আছড়ে পড়ে বিষখালী নদীর দুই তীরজুড়ে মানববসতিতে। নদীর ঢেউ ১০-১৫ ফুট উঁচু হয়ে গ্রাম-গঞ্জ প্লাবিত করে। মুহূর্তের মধ্যে মানুষ, গবাদিপশু, ঘরবাড়ি, সবই ভেসে যায়। পাথরঘাটার চর অঞ্চলে বহু পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ে।

পাথরঘাটার পদ্না ভেরিবাঁধ এলাকার একজন প্রবীণ বাসিন্দা আমাদের বলেন, সন্ধ্যার পর থেকেই পানির চাপ বাড়তে থাকে, কিছু সময় পরে এখানকার ভেরিবাঁধটি পানির চাপে ভেঙে যায়। "নদীর পানি যেন আগুনের মতো ছুটে এসেছিল। চোখের সামনে মানুষ হারিয়ে গেছে, কিন্তু রক্ষা করতে পারিনি।" আমাদের শেষ সম্বলটুকুও নিয়ে গিয়েছে ভয়াল সিডর।

বিষখালী নদী উপকূলে তখন হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়। অনেকে স্বজনের মৃতদেহ কখনোই পাননি। নদীর স্রোত তাদের যেন গিলে নিয়েছিল। এখনো সিডর বেঁচে থাকা মানুষের মনে সবচেয়ে কষ্টের বিষয়—স্বজন হারানোর সেই আর্তনাদ, মানুষের লাশ ভেসে ওঠা, পুরো গ্রামজুড়ে শোকে ছেয়ে যাওয়া।

ঘূর্ণিঝড়ে ভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ে এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। টিনের ঘর, বাঁশের বেড়া, মাছধরা নৌকা—সব নদীতে তলিয়ে যায়। পাথরঘাটা ২ নং ওয়ার্ডের ভেরিবাঁধ এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, সেই রাতের কথা এখনো মনে পড়লে ঠিক থাকতে পারি না। 'আমরা বেঁচেছিলাম, কিন্তু বেঁচে থেকেও যেন বাঁচিনি। হাতে ছিল না এক মুঠো চাল, মাথার ওপর ছিল না ছাউনি। আমাদের ঘরসহ সব ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে।'

এখনো সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন উপকূলের মানুষ। তাদের স্মৃতিতে আজও ভেসে ওঠে শত শত মানুষের আত্মচিৎকার আর স্বজনদের আহাজারি। এখনো সন্তানহারা বাবা-মা, বাবা-মা হারা সন্তানরা পথের দিকে তাকিয়ে থাকে তারা ফিরবে এই আশায়।

উপকূল সাংবাদিক ও গবেষক শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, "সিডরের ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূলের মানুষের মনে সেই রাতের আতঙ্ক এখনো তাজা। বিষখালী নদীর তীরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে গেলে আজও অনেকের চোখ ভিজে ওঠে। ঘরবাড়ি হারানো, প্রিয়জনের নিথর দেহ খুঁজে পাওয়ার সেই দগদগে স্মৃতি পাথরঘাটা, বামনা, পুরো উপকূলের মানুষ ভুলে যেতে পারেনি। পুনর্বাসন ও উন্নয়ন হলেও মানুষের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল—তা এখনো সেরে ওঠেনি। মানুষ এখনো বলেন—'সেই রাতটা যেন আর কখনও না আসে।'"

সিডরের পর কেটে গেছে ১৮ বছর, কিন্তু উপকূলবাসীর জীবনে ক্ষতচিহ্ন এখনো রয়ে গেছে। অনেক পরিবার এখনো অর্থসংকট, নদীভাঙন ও জীবিকা সংকটে ভুগছে। লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি আগের মতো উর্বর হয়নি। উপকূলের মানুষ আজও বলেন, “সিডর আমাদের শিখিয়েছে, উপকূল কতটা ভঙ্গুর আর আমাদের জীবন কতটা অনিরাপদ।”

বরগুনা ও বাগেরহাট এলাকায় এখনো সিডরের ক্ষতি বয়ে বেড়াচ্ছে, হিসাব বলছে বরগুনায় ২৯ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের ধারে বসবাস করছে কয়েক হাজার মানুষ। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতের পর থেকে বরগুনায় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ২৮০ একর জমি।

তাই বিভিন্ন সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা নিহতদের স্মরণে মিলাদ, আলোচনা ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করে থাকে এবং ছাত্রছাত্রীদের মাঝে দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জলোচ্ছ্বাস প্রতিরক্ষা বাঁধ আরও শক্তিশালীকরণ, আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি ও আধুনিকীকরণ, নদীভাঙন রোধে জরুরি ব্যবস্থা, জীবিকা পুনর্গঠন প্রকল্প জোরদার—এগুলোই উপকূলের মানুষের একটাই প্রত্যয়।

Link copied!