এক সময়ের শান্ত, সবুজ আর পর্যটননির্ভর জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল মৌলভীবাজার। চা-বাগান, পাহাড়ি সৌন্দর্য আর নিরিবিলি পরিবেশের জন্য পরিচিত এই জেলাটি এখন ধীরে ধীরে গ্রাস করছে ভয়াবহ মাদক সংকট। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও বিদেশি মদের অবাধ বেচাকেনায় বিপন্ন হয়ে উঠছে তরুণ সমাজ। আর মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলেই নেমে আসছে হামলা, মারধর, এমনকি মৃত্যুর হুমকি। ফলে আতঙ্ক আর নীরবতার এক অদৃশ্য দেয়ালে বন্দি হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, রাজনগর, বড়লেখা ও কমলগঞ্জ উপজেলাজুড়ে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে মাদক পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত দিয়ে সহজেই প্রবেশ করছে ইয়াবা ও বিভিন্ন মাদকদ্রব্য, যা পরে সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের অনেকেই রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাধর মহলের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে প্রশাসনের অভিযানে খুচরা বিক্রেতারা ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাধারণ মানুষ অভিযোগ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নাম প্রকাশ করতে সাহস পান না। কারণ, প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ।
সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অবস্থান নেওয়ায় হামলা ও হত্যার কয়েকটি ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল এলাকায় আয়োজিত এক মাদকবিরোধী সমাবেশে ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা অভিযোগ করেন, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে কথা বললেই তাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। কেউ কেউ বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানান।
সমাবেশে সন্তানহারা এক মায়ের কান্নাজড়িত বক্তব্য উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। তিনি বলেন,
“আমার ছেলেকে মাদকের কারণে মেরে ফেলেছে। আমি আমার সন্তানের হত্যার বিচার চাই।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের কারণে পারিবারিক অশান্তি, চুরি, ছিনতাই ও কিশোর অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। একসময় স্কুলমুখী অনেক কিশোর এখন মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও অসহায়ত্ব। অনেক পরিবার সামাজিক লজ্জা ও নিরাপত্তার ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছে না।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকার দাবি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত তিন মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় এক কোটি টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার এবং অন্তত ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু সচেতন মহলের মতে, শুধুমাত্র খুচরা বিক্রেতাদের আটক করে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) নোবেল চাকমা বলেন,
“মাদক নির্মূলে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছি। পুলিশের প্রতিটি টিম সক্রিয় রয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেফতার ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—অভিযান চললেও কেন থামছে না মাদকের বিস্তার? কেন এখনও অধরা থেকে যাচ্ছে মূল নিয়ন্ত্রকেরা? সীমান্ত এলাকায় নজরদারির দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সামাজিক প্রতিরোধের অভাবকে দায়ী করছেন সচেতন নাগরিকরা।
তাদের মতে, সীমান্ত রুটে কঠোর নজরদারি, প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক আন্দোলন ছাড়া মৌলভীবাজারকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। না হলে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ আরও গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যেতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :