আকতারু জ্জামান, দেবীগঞ্জ: পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে আলোচনা সভা ও শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হলেও মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত শহীদ বুদ্ধিজীবী ও সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল কাদের মিয়ার কবর জিয়ারত করা হয়নি। দিবসের সরকারি কর্মসূচিতে তাঁর কবর জিয়ারত অন্তর্ভুক্ত না থাকায় প্রশাসনিক অবহেলা ও ইতিহাসচর্চার ঘাটতি
নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রবিবার (১৪ ডিসেম্বর) সকাল ১০টায় দেবীগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের শহীদ মিনারে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। পরে সকাল ১১টায় উপজেলা পরিষদ হলরুমে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাহমুদুল হাসান।
এতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তবে দিবসটির আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে শহীদ বুদ্ধিজীবী আব্দুল কাদের মিয়ার কবর জিয়ারত না থাকায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শহীদ বুদ্ধিজীবী আব্দুল কাদের মিয়া ১৯৩০ সালের ১ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার জামিরতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ২৭ মার্চ তিনি দেবীগঞ্জ থানায় বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করে ঘোষণা দেন—“এখন থেকে দেবীগঞ্জ স্বাধীন।” তিনি মুক্তিকামী যুবকদের প্রশিক্ষণ দেন, থানার অস্ত্রশস্ত্র তাদের হাতে তুলে দেন
এবং নিজেও প্রতিরোধ যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি ভারতের হলদিবাড়ি এলাকাতেও যান বলে জানা যায়।
১৯৭১ সালের ৩১ মে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে এক সংঘর্ষে তিনি আহত হন। পরে পাকিস্তানি সেনারা শান্তি কমিটির সহযোগিতায় ১ জুন সকালে তাঁকে আটক করে দেবীগঞ্জের ব্রুজেরডাঙ্গা এলাকায় নিয়ে হত্যা করে এবং লাশ মাটিচাপা দেয়। স্বাধীনতার পর ওই স্থান থেকে তাঁর ব্যবহৃত জুতা, মোজা, আংটি ও কলম উদ্ধার করা হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৯৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শহীদ পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল কাদের মিয়াকে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়। তাঁর স্মরণে দুই টাকার স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। এছাড়া দেবীগঞ্জে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পঞ্চগড় পুলিশ লাইনে একটি গ্রন্থাগার এবং একটি সড়ক তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দিবসে একজন স্বীকৃত শহীদ বুদ্ধিজীবীর কবর জিয়ারত না হওয়া দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। ভবিষ্যতে সরকারি কর্মসূচিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তারা।
দেবীগঞ্জের প্রবীণ সাংবাদিক জাকির হোসেন কবির রাজু বলেন, “বিগত বছরগুলোতে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শহীদ ওসি আব্দুল কাদের মিয়ার কবর জিয়ারত করা হতো। এ বছর কেন করা হয়নি, তা স্পষ্ট নয়।”
এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবী—এই বিষয়টি আজ প্রথম জানলাম। সাধারণত তাঁর কবর ১৬ ডিসেম্বর জিয়ারত করা হয়। বিষয়টি জানা না থাকায় এবার জিয়ারত করা হয়নি।”
আপনার মতামত লিখুন :