হলুদ চাদরে মোড়ানো চৌহালীর কৃষি মাঠ, সরিষা ফুলে মৌমাছির গুঞ্জন

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০২:০৩ পিএম

মাহমুদুল হাসান, চৌহালী: সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ফসলের মাঠ এখন সরিষা ফুলে হলুদ রঙে সেজেছে। চোখ মেললেই মন জুড়িয়ে যায়। পুরো মাঠ যেন ঢেকে আছে হলুদ চাদরে। ফুলে মৌমাছি আর প্রজাপতির নাচনে গ্রামীণ জনপদ হয়ে উঠেছে আরও মনোমুগ্ধকর। প্রকৃতি যেমন অপরূপভাবে সেজেছে, ঠিক সেই সঙ্গে মেতে উঠেছে পেশাদার মধু সংগ্রহে মৌয়ালরা।

সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহে এসব জমির পাশে পোষা মৌমাছির শত শত বাক্স নিয়ে হাজির হয়েছে মৌয়ালরা। বাক্স থেকে হাজার হাজার মৌমাছি বের হয়ে মধু সংগ্রহে ঘুরে বেড়াচ্ছে সরিষার ফুলে ফুলে। এই অপরূপ দৃশ্য যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে আকৃষ্ট করবে। বেশিরভাগ মৌচাষী এসেছেন সাতক্ষীরা, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। এই সরিষা থেকেই মিলছে খাঁটি তেল, গরুর স্বাস্থ্যকর খাবার খৈল এবং জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে সরিষার গাছ। সরিষা চাষে খরচও কম, তাইতো কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় উপজেলাজুড়ে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ব্যাপকভাবে সরিষা চাষ হয়েছে।

মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত চৌহালীর কৃষি মাঠ। মৌমাছি সরিষার ফুলে ফুলে উড়ে মধু সংগ্রহ করে। এতে সরিষা ফুলে সহজেই পরাগায়ন ঘটে। সরিষাক্ষেতের পাশে মৌচাষের বাক্স স্থাপন করলে সরিষার ফলন অন্তত ২০ শতাংশ বাড়ে। তৎসঙ্গে মৌচাষিরা মধু আহরণ করেও লাভবান হন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার খাষকাউলিয়া, বাহলগড়া, বৈন্যা-কোদালিয়া, রেহাই পুকুরিয়া, ঘোরজানসহ বিভিন্ন এলাকায় মৌচাষীরা সরিষাক্ষেতের পাশে মৌচাষ করছেন। এসব জমিতে সরিষার ফুল ফুটেছে সপ্তাহ দু-তিনেক আগেই। ফুলের মধু আহরণে নেমেছেন পেশাদার মৌয়ালরা। তাদের বাক্স থেকে দলে দলে উড়ে যাচ্ছে পোষা মৌমাছি, আর সংগ্রহ করছে মধু। মুখভর্তি মধু সংগ্রহ করে মৌমাছিরা ফিরছে বাক্সে রাখা মৌচাকে। সেখানে সংগৃহীত মধু জমা করে আবার ফিরে যাচ্ছে সরিষাক্ষেতে। এভাবে দিনব্যাপী মৌমাছিরা যেমন মধু সংগ্রহ করে, তেমনই ফুলে ফুলে ঘুরে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে পুরো জমির পরাগায়নেও সহায়তা করে। এ মৌসুমে মৌয়ালরা পোষা মৌমাছি দিয়ে প্রচুর মধু উৎপাদন করে যেমন লাভবান হচ্ছেন, ঠিক তেমনি মৌমাছির ব্যাপক পরাগায়নে সরিষার বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনায় চাষিরাও বাড়তি আয়ের আশা করছেন।

বর্তমানে মৌচাষে প্রতি বাক্স থেকে সপ্তাহে ৪-৫ কেজি মধু সংগ্রহ করা যায়। তবে অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে মধু সংগ্রহ বেশি হয়। ২৫০টি বাক্সে ৩২০ থেকে ৩৫০ কেজি মধু সংগ্রহ করা হয়, যার বাজারমূল্য ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা। মৌচাষে অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে। মৌচাষের কারণে একদিকে যেমন সরিষা উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে অল্প খরচে মৌচাষ দূর করতে পারে বেকারত্ব।

মৌয়াল ব্যবসায়ী উজ্জ্বল ও আমিনুর জানান, "আমাদের আনিশা অ্যাগ্রো ফুড, সাতক্ষীরা-এর মাধ্যমে আমরা প্রতি বছর সরিষাক্ষেত থেকে অনেক খাঁটি মধু সংগ্রহ করে থাকি। বৈন্যা গ্রামে ২০০ বক্স বসানো হয়েছে। এসব মধুর অনেক চাহিদা, বেশ ভালো দামে মধু বিক্রি করা যায়। আগে সরিষা চাষিরা মনে করতো যে এভাবে মধু সংগ্রহ করলে সরিষার ক্ষতি হয়। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পেরেছে মধু সংগ্রহে সরিষার ফলন আরও ভালো হয়।"

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ জাহিদুল ইসলাম জানান, উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে এ বছর প্রায় ২ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। উচ্চ ফলনশীল ও স্থানীয় উভয় জাতের সরিষা কৃষকরা চাষ করেছেন। দুই জাতের সরিষা নভেম্বরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আবাদ করতে হয়। ফসল ঘরে উঠতে সময় লাগে জাতভেদে ৭৫ থেকে ৯০ দিন। স্থানীয়ভাবে কোনো মৌচাষ করা হয় না। যারা মৌচাষ করছেন তারা সকলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মৌয়াল। তাই এখানে মৌচাষে এলাকার চাষীদের উদ্বুদ্ধকরণে কার্যক্রম শুরু করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

Link copied!