ময়মনসিংহে কিস্তিতে মিলছে অস্ত্র, আতঙ্কে নগরবাসী

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০১:৪৩ পিএম

শায়লা শারমিন, সীমান্ত সংবাদদাতা: ময়মনসিংহ নগরী ও ভালুকা উপজেলাসহ আশপাশের এলাকায় কিস্তিতে আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির ভয়ংকর প্রবণতা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। হাত বাড়ালেই মিলছে অবৈধ পিস্তলসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র। ফলে কিশোর-তরুণ এমনকি স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের হাতেও সহজে পৌঁছে যাচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। এ পরিস্থিতিতে গড়ে উঠছে একের পর এক কিশোর গ্যাং, যা জনমনে চরম উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ময়মনসিংহ নগরী ও ভালুকা এলাকা এখন দুর্ধর্ষ অস্ত্রবাজ সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। অলিগলি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে অস্ত্রের কেনাবেচা। কিস্তিতে অস্ত্র দেওয়ার ‘বিশেষ সুবিধা’ থাকায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে অল্প বয়সীরা।

সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত কিছু এলাকা: নগরীর ঐতিহ্যবাহী আকুয়া মহল্লাসহ কয়েকটি এলাকা সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসের জনপদে রূপ নিয়েছে। মাদক, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের আনাগোনায় এলাকাগুলো কার্যত গ্যাং স্পটে পরিণত হয়েছে। প্রকাশ্যে অস্ত্রের ঝনঝনানি ও গোলাগুলির ঘটনায় পুরো ময়মনসিংহবাসী আতঙ্কিত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর উত্থান ঘটেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায়। এসব চক্রের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। প্রতিবাদ কিংবা মামলা করতে গেলে বাড়িতে ঢুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যা ও গুমের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সীমান্ত দিয়ে আসছে অবৈধ অস্ত্র: গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বৃহত্তর ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুরের সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ পিস্তলসহ ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র ঢুকছে নগরীতে। ‘মেইড ইন ইউএসএ’ লেখা পিস্তল ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি ভারতের তৈরি ‘ফাইভ স্টার’ পিস্তলের চাহিদাও সবচেয়ে বেশি।

অস্ত্র ব্যবসায়ীদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, চোরাচালানে আসা অস্ত্রের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হওয়া অস্ত্রের সংখ্যা খুবই কম। আগে র‌্যাব, পুলিশ ও ডিবির নিয়মিত অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার হলেও বর্তমানে অভিযান কার্যত শুন্য কোটায় নেমে এসেছে।

দালালের মাধ্যমে অস্ত্র হস্তান্তর: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সদস্য জানান, অস্ত্র কেনাবেচায় দালালরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দালালের মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতার যোগাযোগ স্থাপন হয়। টাকা নেওয়ার পর বিক্রেতারা মোবাইল ফোনে জানিয়ে দেয় নির্দিষ্ট কোনো ব্রিজের নিচে বা গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা আছে অস্ত্র, সেখান থেকেই তা সংগ্রহ করতে হয়।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দাপট: সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, ময়মনসিংহের অস্ত্রবাজ সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আধিপত্য বিস্তার, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ভাড়াটে খুনে এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক সময় গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে ‘বড় ভাইদের’ নাম, যাদের অনেকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত।

নগরজুড়ে অস্ত্রবাজদের অবস্থান: ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাচিঝুলীমোড়, ইটাখোলা, আনন্দমোহন কলেজ রোড, টাউনহল মোড়, সানকিপাড়া রেলক্রসিং, জিলা স্কুল মোড় ও আশপাশের গলি, আকুয়া ভাঙ্গাপুল, বাইপাস মোড়, পুলিশ লাইন, বাকৃবি এলাকা, কেওয়াটখালি, পাটগুদাম ব্রিজমোড়, শম্ভুগঞ্জ, কালিবাড়ী, চরপাড়া, মাসকান্দা ও ছত্রিশবাড়ী কলোনিসহ নগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই অস্ত্রবাজ গ্রুপের তৎপরতা রয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে সমন্বিত ও ধারাবাহিক অভিযান না চালানো হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

Advertisement

Link copied!