রেজাউল করিম রেজা, চট্টগ্রাম থেকে ফিরে: চট্টগ্রাম মহানগরীর আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৩৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৯টি ২০ তলা আবাসিক ভবন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত বিভাগ চট্টগ্রাম সার্কেল-২ এর একাধিক প্রকৌশলী আওয়ামী লীগপন্থী তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ পাইয়ে দিয়ে বিপুল অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নিয়েছেন।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পে জমির মূল্য ছাড়াই ফ্ল্যাট নির্মাণ ব্যয় বেসরকারি আবাসন কোম্পানির বিক্রয়মূল্যের কাছাকাছি দেখানো হয়েছে, যা অস্বাভাবিক। একই সঙ্গে ভবন নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও সত্যতা পেয়েছে। এতে ভূমিকম্পপ্রবণ চট্টগ্রামে ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ এর উপপরিচালক রিয়াজ উদ্দিন জানান, ইতোমধ্যে ভবনগুলোর ভৌত অবকাঠামো পরিমাপ করা হয়েছে এবং অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে দোষী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদক সূত্র জানায়, প্রকল্পের কাজ শুরুর এক বছরের মধ্যেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০২০ সালে প্রথম অনুসন্ধান শুরু হলেও তা মাঝপথে থেমে যায়। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর নতুন করে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে দুদক। এতে বড় ধরনের দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গণপূর্ত বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, তিনটি করে ভবন নিয়ে তিনটি প্যাকেজ করায় প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে অনেক অভিজ্ঞ ঠিকাদার দরপত্রে অংশ নিতে পারেননি। একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতেই প্যাকেজ মূল্য বাড়ানো হয় বলে অভিযোগ।
৩৯৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে রয়েল অ্যাসোসিয়েট, ফ্রেন্ডস অ্যাসোসিয়েট ও জামাল এন্টারপ্রাইজ নামে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৌশলীদের সহযোগিতায় তারা প্রকল্প বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ কমিশন দিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে নাফ, কর্ণফুলী, সাঙ্গু, হালদা, মাতামুহুরি, বাঁকখালীসহ নদীর নামে নামকরণ করা ৯টি ভবনে বর্তমানে ৯ম থেকে ১২তম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বসবাস করছেন। প্রতিটি ভবনে তিনটি করে লিফটসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পটির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহম্মদ আশিফ ইমরোজ এবং নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন আহমেদ। তবে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে তারা দাবি করেছেন, মানদণ্ড মেনেই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে এবং কমিশন লেনদেন সম্পর্কে তারা অবগত নন।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ২৬ জুন একনেকে অনুমোদিত এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় একই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রকল্পটি উদ্বোধন করা হয়। তবে উদ্বোধনের পরও প্রকল্পটি ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আপনার মতামত লিখুন :