মোঃ দিদারুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কার্যক্রমে দুর্নীতি, ঘুষবাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করেছে। ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলা প্রকৌশলী জয়শ্রী দে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের আড়ালে এসব দুর্নীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন।
ঠিকাদারদের দাবি, প্রকল্প বরাদ্দ, ফাইল চলাচল ও বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে জয়শ্রী দে সরাসরি ঘুষ আদায় করছেন। তাদের ভাষ্য, “ঘুষ না দিলে ফাইল নড়ে না, বিলও ছাড় হয় না।” এতে অনেক ঠিকাদার চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন, কেউ কেউ কাজ পুরোপুরি বন্ধ করতেও বাধ্য হয়েছেন। ফলে এলজিইডির অধীনে সড়ক উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে অচলাবস্থা ও স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, জয়শ্রী দে প্রতিটি প্রকল্প বরাদ্দ থেকে প্রায় ৫ শতাংশ কমিশন আদায় করছেন। শুধু তাই নয়, কাজ শেষ হওয়ার পর বিল পেতে গেলেও ‘টেবিলমানি’ নামে অতিরিক্ত ঘুষ দিতে হচ্ছে। এতে করে প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশ সড়ক, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের পরিবর্তে একটি ঘুষ-সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, “এলজিইডির যেকোনো কাজে জয়শ্রী দে’র টেবিলে ঘুষ না দিলে কোনো ফাইলই এগোয় না। ফলে প্রকল্পের কাজ মারাত্মকভাবে ধীরগতিতে চলছে এবং বরাদ্দের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।”
অভিযোগ রয়েছে, জয়শ্রী দে পূর্বে ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক এমপি ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের প্রভাব ব্যবহার করে নানা অনিয়মে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে তিনি এক উপদেষ্টার ছত্রছায়ায় থেকে আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এদিকে এসব অভিযোগ শোনা সত্ত্বেও নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান আলীর নীরব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ঠিকাদাররা।
ঠিকাদারদের মতে, এসব অনিয়ম শুধু আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং এলজিইডির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। অনেক এলাকাবাসী জানেন না যে, রাস্তা, ব্রিজ ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দের বড় অংশ ঘুষ-সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং জনগণের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জয়শ্রী দে’র ক্ষমতার দাপটে স্থানীয় প্রশাসন ও ঠিকাদারদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা বিরাজ করছে। একাধিক ঠিকাদার বলেন, “সরকার বদলালেও জয়শ্রী দে বদলাননি। বরং তার ঘুষ আদায়ের পদ্ধতি আগের চেয়েও ভয়াবহ হয়েছে। বহুবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাইনি।”
এলজিইডির অধীনে সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম চলতে থাকলে এর প্রভাব শুধু ঠিকাদারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের জীবনমানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
হাটহাজারী উপজেলায় এলজিইডির প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ মূলত সড়ক, জলপথ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। কিন্তু ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, জয়শ্রী দে’র কারণে এই অর্থের বড় অংশ ঘুষের মাধ্যমে হারিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রকল্পের মান নিম্নমানের হচ্ছে এবং জনগণ প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
একজন স্থানীয় নাগরিক বলেন, “উন্নয়নের নামে যে টাকা বরাদ্দ হয়, তার বড় অংশ যদি ঠিকাদারদের হাতে পৌঁছায় না, তাহলে কাজের মান ভালো হবে কীভাবে? বরাদ্দ শেষ হয়ে যায়, অথচ কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।”
এই অনিয়ম শুধু স্থানীয় প্রশাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে না, বরং সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে। প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে হাটহাজারীতে এলজিইডির উন্নয়ন কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে চরমভাবে ব্যাহত হবে।
সর্বোপরি, উপজেলা প্রকৌশলী জয়শ্রী দে’র কর্মকাণ্ড এলজিইডির স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ভেঙে দিচ্ছে। দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে এলজিইডির উন্নয়ন প্রকল্পগুলো মারাত্মক সংকটের মুখে পড়বে।
আপনার মতামত লিখুন :