পুলিশ বাহিনীকে দুর্বল করার লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পিতভাবে নানামুখী ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে । আন্দোলনের সময় গুলি চালানো ও লাশ গোপনের ঘটনায় অভিযুক্ত কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য নেপথ্যে থেকে সক্রিয়ভাবে অপপ্রচারে জড়িত—এমন তথ্য জানিয়েছে দায়িত্বশীল সূত্র। অভিযোগ রয়েছে, তারা মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বঞ্চিত ও ত্যাগী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সাজানো গল্প ছড়িয়ে দিচ্ছে।
সূত্রগুলো বলছে, এসব অপপ্রচারের উদ্দেশ্য হলো পুলিশ বাহিনীর পেশাদার ও ত্যাগী কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া, যাতে বর্তমান সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অথচ ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করছে।
ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় ইতোমধ্যে সুনির্দিষ্ট মামলায় দু’জন সাবেক আইজিপি ও একজন সাবেক পুলিশ কমিশনার গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে নির্বিচারে গুলি চালানোর সঙ্গে জড়িত ও হুকুমদাতা আরও অনেক কর্মকর্তা এখনও অধরা। রহস্যজনক কারণে ৯৪ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ পর্যন্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে মোট ২৯৭টি মামলা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে যারা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ভঙ্গুর পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠনে দিন-রাত কাজ করছেন, তাদের বিরুদ্ধেই চলছে নানামুখী ষড়যন্ত্র।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে ক্যাডার কর্মকর্তার সংখ্যা ৩ হাজার ৫৫০ জন, যেখানে এক সময় তা ছিল এক হাজারেরও কম। বর্তমানে এসপি পদে রয়েছেন প্রায় ৮০০ জন, অথচ জেলা মাত্র ৬৪টি। ডিআইজির সংখ্যা প্রায় ১২০ জন হলেও রেঞ্জ ও মেট্রোসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে কার্যকরভাবে পদায়ন সম্ভব মাত্র ২০ জনের। অতিরিক্ত আইজিপি পদ রয়েছে ৩২টি—এর মধ্যে ২২টি গ্রেড-টু এবং বাকি ১০টি সুপারনিউমারারি। ফলে সব বঞ্চিত কর্মকর্তাকে পছন্দের পদে পদায়ন করা বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি আরও জানান, অতীতে অবৈধ ক্ষমতা ব্যবহার করে যেসব কর্মকর্তা শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, তারাই এখন নেপথ্যে থেকে পুলিশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে দুদকসহ বিভিন্ন দপ্তরে বেনামি ও ভুয়া অভিযোগ জমা দিচ্ছেন।
সূত্র জানায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ–এর প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের একটি অংশ মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য—পুলিশ বাহিনীর পেশাদার ও ত্যাগী কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দিয়ে আসন্ন নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারকে দুর্বল করা। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
এদিকে পুলিশ সংস্কারের দাবিগুলো যৌক্তিকভাবে বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ইতোমধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে, যা কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
ছাত্র-জনতার এই গণ-অভ্যুত্থানের পরও যারা জনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত না হয়ে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের দোসর হিসেবে পলাতক রয়েছেন, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।
সূত্র আরও জানায়, বিগত সময়ের প্রভাবশালী অনেক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনৈতিকভাবে বিপুল অর্থসম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের প্রতি জনক্ষোভের কারণ হিসেবে দায়িত্বহীনতা, দলীয় আজ্ঞাবহতা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। দীর্ঘদিন কমান্ডিং থেকে নিচের স্তর পর্যন্ত অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলেছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে বাহিনীকে সংস্কার করতে হবে। বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দলের চাপ নেই—এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুলিশের ভেতরের ‘আবর্জনা’ দূর করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা দৈনিক প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, প্রায় ১৬ বছর ধরে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করা হয়েছিল। আজীবন ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার নীলনকশার অংশ হিসেবেই বর্তমান পুলিশ বাহিনীকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।
আপনার মতামত লিখুন :