ইসলামি বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শা'বান মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসের ১৫ তারিখের রাত উপমহাদেশে শব-ই বরাত নামে পরিচিত। "শব" অর্থ রাত এবং "বরাত" অর্থ মুক্তি বা নাজাত। এই রাতকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে ইবাদত-বন্দেগি, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। তবে শব-ই বরাতের ফজিলত ও আমল সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে হলে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিষয়টি অনুধাবন করা জরুরি।
কুরআনে সরাসরি "শব-ই বরাত" শব্দটি উল্লেখ নেই। তবে সূরা আদ-দুখানে আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই আমি এক বরকতময় রাতে কুরআন নাজিল করেছি।" (সূরা আদ-দুখান: ৩) এবং বলা হয়েছে, "সে রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়।" (সূরা আদ-দুখান: ৪) অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে "বরকতময় রাত" বলতে লাইলাতুল কদরকে বোঝানো হয়েছে। তবে কিছু তাবেঈ আলেম এই আয়াতের সঙ্গে ১৫ই শা'বানের রাতের সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ কুরআনে সরাসরি দলিল না থাকলেও ব্যাখ্যাগত আলোচনায় এই রাতের গুরুত্ব উঠে এসেছে।
শব-ই বরাতের মূল ফজিলত প্রমাণিত হয়েছে হাদিস শরীফের মাধ্যমে। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, "আল্লাহ তাআলা শা'বান মাসের মধ্যরাতে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং অসংখ্য মানুষকে ক্ষমা করেন।" (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ) আরেক হাদিসে এসেছে, "এই রাতে আল্লাহ তাআলা সব সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।" (মুসনাদ আহমদ, সহিহ ইবনে হিব্বান) মুহাদ্দিসগণ বলেন, এসব হাদিস একত্রে বিবেচনা করলে তা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, এই রাত আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভের এক বিশেষ সুযোগ।
সালাফে সালেহীন ও তাবেঈনদের অনেকেই এই রাতে নফল ইবাদত ও দোয়ায় মনোনিবেশ করতেন। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) উল্লেখ করেছেন, পাঁচটি রাতে দোয়া কবুল হয়, এর মধ্যে শা'বানের মধ্যরাত্রি অন্যতম। তবে তারা এই রাতকে উৎসবের মতো উদযাপন করেননি এবং নির্দিষ্ট নিয়মে দলবদ্ধ আমলের প্রচলনও ছিল না।
শব-ই বরাতে করণীয় আমলের মধ্যে রয়েছে নফল নামাজ আদায়, বেশি বেশি ইস্তিগফার ও তাওবা, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও মুনাজাত এবং মানুষের প্রতি বিদ্বেষ ও হিংসা পরিহার করা। বিশেষভাবে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করাই এই রাতের মূল শিক্ষা। একই সঙ্গে কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকা জরুরি। যেমন—নির্দিষ্ট রাকাআত ও পদ্ধতিতে নামাজকে বাধ্যতামূলক মনে করা, আতশবাজি ও অপচয়, কুসংস্কার, কিংবা শিরক ও বিদআতমূলক কার্যকলাপ। ইসলাম কখনোই অতিরঞ্জন সমর্থন করে না।
পরিশেষে বলা যায়, শব-ই বরাত কোনো আনুষ্ঠানিক উৎসবের রাত নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনা, ক্ষমা প্রার্থনা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মূল্যবান সুযোগ। কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনার আলোকে সুন্নাহসম্মত আমলের মাধ্যমে এই রাত অতিবাহিত করলেই প্রকৃত অর্থে শব-ই বরাতের তাৎপর্য বাস্তবায়িত হবে।
আপনার মতামত লিখুন :