মাটির নিচে লুকানো ইতিহাস: সংরক্ষণের ছোঁয়া পেল জুড়ীর গণকবর

মোঃ আব্দুস সামাদ আজাদ , মৌলভীবাজার জেলা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ২৪ মার্চ, ২০২৬, ০৮:৪৮ পিএম

কোলাহলমুখর বাজার, মানুষের আনাগোনা, জীবনের ব্যস্ততা—সবকিছুর মাঝেই নীরবে লুকিয়ে ছিল এক বেদনাবিধুর ইতিহাস। মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ভবানীগঞ্জ বাজারের সেই গণকবর, যেখানে ১৯৭১ সালের শহীদদের নিঃশব্দ উপস্থিতি মিশে আছে, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পর অবশেষে তা পাচ্ছে সম্মানজনক সংরক্ষণ।

ভবানীগঞ্জ বাজারে গেলে প্রথমে চোখে পড়ে সাধারণ একটি জনপদ—দোকানপাট, ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় আর প্রতিদিনের জীবনের চেনা ছন্দ। কিন্তু এই পরিচিত দৃশ্যের আড়ালেই রয়েছে এক রক্তাক্ত অতীত, যা কান্না আর আত্মত্যাগে ভরা।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই এলাকাটি ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্মমতার এক ভয়ংকর সাক্ষী। স্থানীয়দের বর্ণনায় উঠে আসে—মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের স্বজনদের ধরে এনে নির্যাতন চালিয়ে এখানে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। পরবর্তী সময়ে লাশগুলো ফেলে রাখা হতো কিংবা তড়িঘড়ি করে মাটিচাপা দেওয়া হতো এই স্থানেই।

স্বাধীনতার পর বহু বছর কেটে গেছে, প্রজন্ম বদলেছে। কিন্তু এই গণকবরটি এতদিন রয়ে গিয়েছিল অযত্ন আর অবহেলায়। মাঝেমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা এখানে এসে দাঁড়াতেন; কেউ খুঁজতেন হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের স্মৃতি, কেউবা করতেন নিঃশব্দ প্রার্থনা।

একজন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, যুদ্ধ শেষে যখন তারা এলাকায় ফিরে আসেন, তখন এই স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখেন মানুষের দেহাবশেষ ও পোশাকের চিহ্ন। সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য আজও তাদের তাড়া করে বেড়ায়।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে সেই অবহেলার অবসান ঘটছে। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হয়েছে গণকবর সংরক্ষণের কাজ। স্থানটি ঘিরে সীমানা নির্ধারণ, পরিচ্ছন্নতা এবং স্মৃতিচিহ্ন স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

স্থানটি পরিদর্শনে এসে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব নাসির উদ্দিন আহমেদ মিঠু বলেন, “এই গণকবর শুধু একটি স্থান নয়, এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে সঠিক ইতিহাস জানতে পারে, সেজন্য এসব স্থান সংরক্ষণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।”

এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, এটি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়—এটি শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধতা ও ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা। জুড়ী মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের এই স্থানটি এখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে একটি স্মৃতিস্তম্ভে। যেখানে মানুষ কেবল শ্রদ্ধা জানাতেই আসবে না, অনুভব করতে আসবে একটি জাতিসত্তার সংগ্রামের গল্প।

আগামীকাল বুধবার (২৫ মার্চ) ‘গণহত্যা দিবস’ উপলক্ষে এই গণকবরের সংরক্ষণ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে। দিনটি হয়ে উঠবে স্মরণ, উপলব্ধি আর প্রতিজ্ঞার এক বিশেষ ক্ষণ।

কারণ, একটি জাতির ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না—তা লুকিয়ে থাকে মাটির গভীরে, মানুষের স্মৃতিতে আর এমন নীরব গণকবরগুলোর মাঝে। সেই ইতিহাসকে পরম মমতায় আগলে রাখাই এখন সময়ের দাবি।

Link copied!