কালু শাহ্ মাজার সংলগ্ন ওভারব্রিজ এখন মৃত্যুফাঁদ, আতঙ্কিত হাজারো মানুষ

মো: ওমর ফারুক রকি , সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড উপজেলার ফকির হাট এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী হযরত খাজা কালু শাহ্ (রঃ) মাজার সংলগ্ন ওভারব্রিজটি এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। মহাসড়কের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ এই ব্রিজের আরসিসি রিটেইনিং ওয়ালে দুটি বিশাল ফাটল দেখা দিয়েছে, যা স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কায় দিন কাটছে পারাপাররত যাত্রী ও শিক্ষার্থীদের।

সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা যায়, ওভারব্রিজটির পশ্চিম পাশের রিটেইনিং ওয়ালে এবং জয়েন্টে ভয়াবহ ফাটল ধরেছে। কংক্রিটের স্ল্যাবগুলো একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। ফাটলের গভীরতা এতটাই বেশি যে, ভেতর থেকে লোহার রড এবং নির্মাণসামগ্রী বেরিয়ে এসেছে। ব্রিজের পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং ড্রেনেজ লাইনেও ফাটলের ছাপ স্পষ্ট।

এই ওভারব্রিজটি শুধুমাত্র মহাসড়কের অংশই নয়, এটি কালু শাহ্ ফাজিল মাদ্রাসা এবং কালু শাহ্ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঠিক পাশেই অবস্থিত। তাছাড়া ব্রিজের পশ্চিম পাশে প্রাথমিক বিদ্যালয় – আমেনা বিদ্যানিকেতন। এই ব্রিজ সংলগ্ন পশ্চিমের বাইপাস সড়ক দিয়ে প্রতিদিন আমেনা বিদ্যানিকেতন, কালু শাহ্ ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রী এবং কালু শাহ্ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা যাতায়াত করে।

এছাড়াও, ব্রিজটির পশ্চিমে রেললাইন এবং একটি বাইপাস সড়ক রয়েছে, যা দিয়ে ছোট-বড় অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। জনবহুল এই এলাকায় ব্রিজের এই জরাজীর্ণ অবস্থা প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। মাদ্রাসা ও স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা আতঙ্ক নিয়েই প্রতিদিন এই ব্রিজের নিচ দিয়ে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছে।

অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী তানিয়া আক্তার বলেন, "প্রতিদিন স্কুলে আসার সময় এই ব্রিজের নিচ দিয়ে পার হতে আমাদের খুব ভয় লাগে। ফাটলগুলো এতো বড় যে মনে হয় এখনই ওপর থেকে কংক্রিটের চাঙড় আমাদের মাথার ওপর ভেঙে পড়বে। বর্ষার দিনে ফাটল দিয়ে পানি পড়ে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে থাকে, তখন ঝুঁকি আরও বাড়ে। আমাদের অনেক বান্ধবী আতঙ্কিত হয়ে স্কুলে আসতেই চায় না। আমরা চাই সরকার দ্রুত এই ব্রিজটি ঠিক করে দিক, যাতে আমরা নিরাপদে স্কুলে যাতায়াত করতে পারি।"

শিক্ষার্থী ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, "ব্রিজটির অবস্থা সত্যিই খুব করুণ। শুধু আমরা নই, মাদ্রাসার ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীরাও এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। আমরা শুনেছি এটা খুব পুরনো ব্রিজ, কিন্তু ফাটল ধরার পরও কেন কেউ এটা মেরামতের উদ্যোগ নিচ্ছে না, তা আমরা বুঝতে পারছি না। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগে কী কর্তৃপক্ষের চোখ খুলবে না? আমরা সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি, দয়া করে আমাদের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে এই ব্রিজটি সংস্কারের ব্যবস্থা করুন।"

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ব্রিজটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘ দিন ধরে এটি সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমানে ফাটল দেখা দেওয়ার পরও কোনো সতর্কবার্তা বা ঝুঁকিপূর্ণ বোর্ড টাঙানো হয়নি।

স্কুলছাত্রীর অভিভাবক মো. আবদুল গফুর জানান, "প্রতিদিন সকালে মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি। ব্রিজের যে বড় বড় ফাটল, তাতে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। আমরা সাধারণ মানুষ, আমাদের কথা শোনার যেন কেউ নেই। কিন্তু এখানে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর জীবনের নিরাপত্তা জড়িত। কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, কোনো বড় প্রাণহানি ঘটার আগেই এই ব্রিজটি সংস্কার করুন। সন্তানদের বিপদে রেখে আমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারছি না।"

মোছাম্মৎ রিনা বেগম নামের আরেক অভিভাবক বলেন, "ফাটল দিয়ে যেভাবে রড বেরিয়ে এসেছে, তা দেখলে বুক কেঁপে ওঠে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তো আর ঝুঁকি বোঝে না, তারা এই ব্রিজের নিচ দিয়েই দৌড়াদৌড়ি করে খেলাধুলা বা যাতায়াত করে। এই রাস্তাটা খুব ব্যস্ত, বিকল্প কোনো পথও নেই। আমাদের একটাই দাবি—প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক। আমাদের সন্তানদের জীবনের কি কোনো দাম নেই? একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলে তো আর সেই ক্ষতি পূরণ হবে না।"

ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, "কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই এই ব্রিজটি আজ এই অবস্থায়। আমরা একাধিকবার স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছি, কিন্তু কোনো ফল পাইনি। একটি বড় দুর্ঘটনার জন্য কী তারা অপেক্ষা করছেন?"

স্থানীয়রা মনে করেন, একটি বড় ধরনের ট্র্যাজেডি এড়াতে অতি দ্রুত এই ওভারব্রিজটি সংস্কার করা প্রয়োজন। কালু শাহ্ মাজার সংলগ্ন ফকির হাট ওভারব্রিজটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে, মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহাসড়ক কর্তৃপক্ষ ও সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসনের জরুরি পদক্ষেপ কামনা করছে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

Link copied!