নড়াইলে দখল-দূষণে মৃত্যুপথযাত্রী চিত্রা নদী, ধরাছোঁয়ার বাইরে ৬৩ দখলদার

রাসেদুল ইসলাম , লোহাগড়া (নড়াইল) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১০ মে, ২০২৬, ০৩:০১ পিএম

নড়াইলের বুক চিরে বয়ে যাওয়া এক সময়ের শান্ত-স্নিগ্ধ চিত্রা নদী এখন মৃতপ্রায়। প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখলের মহোৎসবের পাশাপাশি নর্দমার বর্জ্য ও প্লাস্টিকে বিষিয়ে উঠছে নদীর পানি। জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটি এখন দখলদারদের থাবায় সংকুচিত হয়ে খালে পরিণত হতে চলেছে। বছরের পর বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী চিত্রা নদী দখল আর দূষণের কবলে পড়লেও প্রশাসনের নেই কোন কার্যকর পদক্ষেপ। জেলা প্রশাসন চিত্রা নদীর

দখলদারদের তালিকা তৈরী করলেও আজও চিত্রা নদী দখলমুক্ত হয় নাই। দিনকে দিন বাড়ছে নদীর পাড় দখলের প্রতিযোগিতা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়টি হলো, প্রশাসনের নাকের ডগায় চিত্রা নদী দখল এবং দূষণ হলেও কর্তৃপক্ষের 'কুম্ভকর্ণের ঘুম' আজও ভাঙ্গে নাই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নড়াইল শহরের পুরাতন টার্মিনাল, মাছিমদিয়া এবং রূপগঞ্জ বাজার সংলগ্ন এলাকায় নদীর দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা। অনেক জায়গায় নদী ভরাট করে দোকানপাট, ঘরবাড়ি এমনকি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও নির্মাণ করা হয়েছে।

স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কয়েক দিন যেতে না যেতেই আবারও দখলদাররা ফিরে আসে। মানচিত্র অনুযায়ী নদীর প্রকৃত সীমানা চিহ্নিত না হওয়ায় দখলের প্রক্রিয়া থামানো যাচ্ছে না।

দখলের পাশাপাশি চিত্রা নদীর বর্তমান প্রধান সমস্যা তীব্র দূষণ। শহরের অধিকাংশ ড্রেনের সংযোগ সরাসরি নদীতে দেওয়া হয়েছে। রূপগঞ্জ বাজারের কসাইখানা ও মাছ বাজারের যাবতীয় বর্জ্য প্রতিদিন মিসছে এই পানিতে। এছাড়াও পলিথিন, ওয়ান টাইম প্লাস্টিক পণ্য এবং ক্লিনিক্যাল বর্জ্য নদীতে প্রতিনিয়ত ফেলার কারণে নদীর তলদেশে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দূষিত পানির দুর্গন্ধে নদীর পাড় দিয়ে চলাচল করা সাধারণ মানুষের জন্য দুঃসহ হয়ে পড়েছে।

এক সময় চিত্রা নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত এবং দেখা মিলত বিলুপ্তপ্রায় শুশুকের। কিন্তু দূষণের ফলে মাছের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং অনেক প্রজাতির দেশি মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নদীতে শুশুক আর দেখা যায় না।

নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন পাড়ের মানুষেরা।

নড়াইলের সচেতন মহলের মতে, 'চিত্রা নদীকে বাঁচাতে হলে শুধু উচ্ছেদ অভিযান যথেষ্ট নয়, নদীর তলদেশ খনন (ড্রেজিং) এবং স্থায়ী সীমানা নির্ধারণ জরুরি। সেই সাথে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করতে হবে যাতে দূষিত পানি সরাসরি নদীতে না পড়ে।

চিত্রা শুধু একটি নদী নয়, এটি নড়াইলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। চিত্রা নদী অবৈধভাবে দখলদারদের উচ্ছেদ ও দূষণমুক্ত করার ব্যাপারে দ্রত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামি কয়েক বছরের মধ্যে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে এই ঐতিহ্যবাহী চিত্রা নদী। পরিবেশবাদী ও স্থানীয় জনসাধারণের দাবি অবিলম্বে "দখল ও দূষণমুক্ত" করে চিত্রা নদীকে তার পুরনো যৌবন ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতা কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, 'আমরা বিগত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চিত্রা নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। সরকার আসে সরকার যায় কিন্তু এ ব্যাপারে তারা মুখে বললেও বাস্তবে তা আলোর মুখ দেখে না'।

জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, জেলার সচেতন মহল, পরিবেশবাদী সংগঠন গুলোর দীর্ঘদিনের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন চিত্রা নদীর দখলদারদের একটি তালিকা তৈরী করলেও তা আজও আলোর মুখ দেখে নাই। সূত্র মতে, কমপক্ষে ৬৩ জন দখলদার ঐতিহ্যবাহী চিত্রা নদী দখল করে রেখেছে।

এ ব্যাপারে নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হোসনে আরি তান্নি বলেন, 'চিত্রা নদী দখল ও দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে আমরা কাজ শুরু করেছি। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য আমরা দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। নদী দূষণের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ব্যাপারেও আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

Link copied!