শিবালয়ে জাফরগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাচীর নির্মাণে জমি দখলের মহোৎসব

মোঃ জাহাঙ্গীর আলম , স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১৩ মে, ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার জাফরগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের নামে সাধারণ কৃষকদের রেকর্ডীয় জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন কবিরের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে একতরফাভাবে অন্যের জমি সীমানা প্রাচীরের ভেতর ঢুকিয়ে নিচ্ছেন। এই প্রক্রিয়ায় পাশের জমির মালিকদের রোপণকৃত অসংখ্য গাছও কেটে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে প্রতিকার না পেয়ে অবশেষে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে জরুরি হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৫ মে কোনো প্রকার দাপ্তরিক নোটিশ ছাড়াই উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একতরফাভাবে জমি পরিমাপ করেন। ভূমি আইন অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণের সময় উভয় পক্ষের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক থাকলেও এখানে তা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক ভাড়াটে লোকবল ও বহিরাগতদের দাপট দেখিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন, যাতে স্থানীয়রা প্রতিবাদ করার সাহস না পায়।

ভুক্তভোগী কৃষক মো. শাহজাহানসহ একাধিক জমির মালিক জানান, তাদের পৈত্রিক ও ক্রয়কৃত বৈধ জমি রক্ষার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), ভূমি অফিস ও থানায় লিখিতভাবে আপত্তি জানানো হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের দৃশ্যমান নিষ্ক্রিয়তাকে পুঁজি করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তড়িঘড়ি করে বিতর্কিত স্থানে পিলার স্থাপন ও দেয়াল নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

আরেক ভুক্তভোগী নুন্নাহার জানান, "আমরা তিন পুরুষ ধরে এই জমি ভোগ দখল করছি। কোনো নোটিশ না দিয়েই আমাদের জমির ভেতর পিলার গেড়ে গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।" ভুক্তভোগী মোকাল বেপারি অভিযোগ করেন, আগের সীমানা ছেড়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পশ্চিম দিকে প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। সুকৌশলে তাদের জমি দখল করা হচ্ছে। আপত্তি জানালেও কাজ চলমান রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে ঠিকাদার নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ করছেন। প্রধান শিক্ষক ও ঠিকাদার মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন যারা প্রতিবাদী কণ্ঠরোধ করছেন। রঘুনাথপুর ও নদীশুখা মৌজার সাধারণ কৃষকদের মধ্যে এই নিয়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, যা যেকোনো সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রাচীর নির্মাণের কাজ পুরোদমে চলছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন কবির পরিমাপের কথা স্বীকার করলেও আপত্তির কোনো কাগজ পাননি বলে দাবি করেন।

অন্যদিকে, মানিকগঞ্জ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইশতিয়াক ইকবাল হিমেল জানান, "সেখানে কাজ চলমান থাকার কথা নয়। পাশের জমি দখল করে প্রাচীর নির্মাণ করা হলে ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করা হবে।" 

তবে বাস্তবে ঠিকাদার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং জানিয়েছেন যে প্রধান শিক্ষকের নির্দেশিত সীমানাতেই তারা কাজ করছেন।

শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রাণী কর্মকার বলেন, "পরিমাপ ত্রুটিপূর্ণ হলে এসি ল্যান্ডকে পুনরায় উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে পরিমাপের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিচ্ছি।"

অবিলম্বে এই অবৈধ ও একতরফা পরিমাপ বাতিল করে জেলা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছ সীমানা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত সমাধান না হলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে যেতে পারে।

Link copied!