শারমিন আক্তার চৌধুরী: ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার পর আবারও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুরসহ বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় গোপন বৈঠক, দোয়া মাহফিল, সাংগঠনিক কর্মসূচি ও কমিটি গঠনের অভিযোগ উঠেছে।
গতকাল নেত্রকোনা সদর থানাধীন কয়েকটি এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তবে নেত্রকোনা পুলিশের দাবি, প্রচারিত ভিডিওগুলো পুরনো।
স্থানীয় সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ সদর, গফরগাঁও, ভালুকা, ফুলপুর, তারাকান্দা, ফুলবাড়িয়া ও ত্রিশাল উপজেলায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পুনর্গঠন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয় করতে গোপন বৈঠক, মোবাইলভিত্তিক যোগাযোগ এবং অনলাইন প্রচারণা চালানো হচ্ছে নিয়মিত।
ত্রিশাল পৌর এলাকায় সম্প্রতি নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। সেখানে ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলামকে সভাপতি এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহিনকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া বালিপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব হিসেবে রুহুল আমিন ও মোহাম্মদের নামও ছড়িয়ে পড়ে।
গফরগাঁওয়ে সাবেক এমপি বাবেল গোলন্দাজের ছবি ব্যবহার করে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ভালুকা উপজেলায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা নূর মোহাম্মদের আয়োজনে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেই ছবি শেয়ার করেন ময়মনসিংহ জেলা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি আল আমিন।
সম্প্রতি বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ব্যানারে দোয়া মাহফিল ও রাজনৈতিক কর্মসূচির ছবি ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব অনুষ্ঠানে সাবেক নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে অংশ নিতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে তরুণ কর্মীদের পুনরায় সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে একাধিক হত্যা, বিস্ফোরক ও রাজনৈতিক মামলার আসামিদের বিরুদ্ধেও দৃশ্যমান কোনো অভিযান না থাকায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিতর্কিত ও মামলাভুক্ত ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘোরাফেরা করলেও প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, “যাদের বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক মামলাও আছে, তারাই এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতা, জেলা পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারির ঘাটতি এবং মাঠপর্যায়ে সমন্বয়হীনতার কারণেই নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
ত্রিশাল থানার ওসি মনসুর আহম্মেদ বলেন, “খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালানো হয়েছে। একজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। ত্রিশালে তারা আগেও সংগঠিত হতে পারেনি, এবারও পারবে না। অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ. স. ম আতিকুর রহমান বলেন, “নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী কর্মসূচি করে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেছে। তারা স্থানীয় হলেও কোথায় কর্মসূচি পালন করেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শনাক্ত হলে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে।”
ভালুকা মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, “নূর মোহাম্মদের আয়োজনে মিলাদ মাহফিলের তথ্য পেয়েছি। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”তবে ফুলপুর থানার ওসি ফিরোজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়গুলো দেখামাত্রই সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল থেকেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো কর্মসূচি করার সুযোগ নেই।”
অন্যদিকে বিএনপির একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন ওসিকে আবারও বিভিন্ন থানায় পদায়ন করা হয়েছে। তাদের দাবি, এসব কর্মকর্তা অতীতে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে সমালোচিত ছিলেন।
নেত্রকোনা জেলা বিএনপির নেতা সাজ্জাদ বলেন, “আওয়ামী লীগ আমলের যেসব ওসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ ছিল, তাদের আবারও দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে দেখে আমরা হতবাক। এ ধরনের কর্মকর্তাদের দ্রুত প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।”
স্থানীয়দের মতে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলোর প্রকাশ্য তৎপরতায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, প্রশাসন যদি দ্রুত দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে মাঠপর্যায়ে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক পুনরুত্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। এতে শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতাই নয়, সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :