‘জানুয়ারিতে কক্সবাজার গেলাম। তখন একটু ঠান্ডাও লাগেনি, কাশিও হয়নি। কিন্তু চার মাস পর হঠাৎ ঠান্ডা লাগল, তারপর সব শেষ। পিকনিকে গিয়ে যে ছবি তুলছিলাম, ওই ছবিই এখন আমাদের শেষ স্মৃতি।’
কথাগুলো বলতে বলতে মুঠোফোনের পর্দায় সাত মাস বয়সী মেয়ে সুমাইয়া আক্তারের ছবি দেখাচ্ছিলেন বাবা উজ্জ্বল মিয়া। পাশে মেয়ের ছোট ছোট জামাকাপড় আর হাসপাতালের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে কান্না করছিলেন মা তানজিলা আক্তার।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার কুমারগাতা ইউনিয়নের লিচুতলা গ্রামের সিএনজিচালক উজ্জ্বল মিয়া ও তানজিলা দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান ছিল সুমাইয়া। ৮ মে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। ১১ মে ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা হয়েছে, হামের লক্ষণের পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও হার্ট ফেইলরের কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।
উজ্জ্বল মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরিবারটি। তানজিলা আক্তার বলছিলেন, মেয়ের অনেক শ্বাসকষ্ট ছিল। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে বুকের দুধ খাওয়াইছিলাম। দুধ খাওয়ানোর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমার মেয়ে মারা গেল।
তার অভিযোগ, সময়মতো টিকা না পাওয়ায় মেয়ের অবস্থা জটিল হয়েছে। টিকা দিতে গেলে বলত টিকা নাই। এভাবে দুই মাস ঘুরছি। সময়মতো টিকা দিতে পারলে আমার বাচ্চা নিউমোনিয়ায় মরতো না।
স্বাস্থ্য বিভাগের টিকা রেজিস্টার বলছে, জন্মের পর বিসিজি টিকা ঠিক সময়ে পেলেও পরবর্তী টিকাগুলো নির্ধারিত সময়ে পায়নি সুমাইয়া। পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ১১ সেপ্টেম্বর। অথচ নিয়ম অনুযায়ী ২৮ দিন পরপর পরবর্তী দুই ডোজ দেওয়ার কথা থাকলেও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় জানুয়ারিতে, তৃতীয় ডোজ ফেব্রুয়ারিতে।
নিউমোনিয়া প্রতিরোধে পিসিভি টিকার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ নির্ধারিত সময়ে দেওয়া হলেও তৃতীয় ডোজ জানুয়ারিতে দেওয়া হয়েছে। ওপিভি ও আইপিভি টিকার ক্ষেত্রেও ছিল বিলম্ব।
পরিবারটির দাবি, স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকার কার্ডও দিতে পারেননি। কারণ কার্ডেরও সংকট ছিল।
এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত থানা স্বাস্থ্য সহকারী নওরীদ শারমিন বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সাপ্লাই পাই না। বাচ্চাটা টিকা পেয়েছে, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে পায়নি। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকেই টিকার সংকট চলছে। গত দুই মাস ধরে বিসিজি আর হাম-রুবেলা ছাড়া অন্য কোনো টিকা ছিল না।
মুক্তাগাছার খামারের বাজার এলাকার আলমগীর হোসেনের সাত মাস বয়সী ছেলে সোলাইমান ১০ মে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ২০ ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায়। মৃত্যুসনদে হামের লক্ষণের পাশাপাশি নিউমোনিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর মঙ্গলবার (১২ মে) রাত ৩টা ১০ মিনিটে মারা যায় ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কদুখালী গ্রামের কৃষক মামুন মিয়ার ১০ মাস বয়সী ছেলে মো. হোসাইন। ৫ মে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তারও মৃত্যুসনদে হামের লক্ষণের পাশাপাশি নিউমোনিয়ার উল্লেখ রয়েছে।
মামুন মিয়া বলেন, জ্বর-ঠান্ডা নিয়ে চারদিন হাসপাতালে ছিল ছেলেটি। পরে ছুটি দেয়। সাতদিন পর আবার ভর্তি করলে হাম ধরা পড়ে। নিউমোনিয়ায় খুব কষ্ট করছিল। অসুখ থাকায় হামের টিকা দিতে পারিনি। এভাবে একমাত্র ছেলেকে হারাব ভাবিনি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ১ মে থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রত্যেকের মৃত্যুসনদেই হামের লক্ষণের পাশাপাশি নিউমোনিয়ার কথা উল্লেখ আছে।
১ মে নেত্রকোণার কলমাকান্দা ও জামালপুরের ইসলামপুরের দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এরপর ৩ মে ফুলপুর, ৪ মে ঈশ্বরগঞ্জ, ৫ মে টাঙ্গাইলের মধুপুর, ৬ মে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ, ৭ মে ত্রিশাল এবং ১১ মে ময়মনসিংহে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়। ১৩ মে মারা যায় জামালপুর সদর ও ঈশ্বরগঞ্জের আরও দুই শিশু। ১৪ মে মারা যায় গাজীপুরের শ্রীপুরের ১ শিশু। ১৫ মে তারাকান্দার ৯ বয়সী আরও এক শিশু মারা যায়।
চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ৩৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩৯২ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ হাজার ২৫৩ শিশু। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১০৬ শিশু।
বুধবার দুপুরে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সন্তানদের নিয়ে উৎকণ্ঠায় ছুটছেন অভিভাবকরা। গুরুতর অসুস্থ শিশুদের ‘বাবল সিপ্যাপ’ পদ্ধতিতে অক্সিজেন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
জামালপুরের ১০ মাস বয়সী শিশু সাদকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন মা সুমী আক্তার। যমজ সন্তানের একজন সুস্থ হলেও এখন দ্বিতীয় সন্তান ও চার বছরের মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে তাকে।
তিনি বলেন, ঠিকমতো টিকা দিতে পারিনি। সময়মতো যদি টিকা দিতে পারতাম, হয়তো এমন হতো না। ডাক্তার বলছে আইসিইউ লাগবে। কিন্তু এখানে আইসিইউ নেই।
ভালুকা থেকে আসা রাসেল আহমেদও একই অভিযোগ করেন। আট মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে চারদিন ধরে হাসপাতালে আছেন তিনি।
তিনি বলেন, সময়মতো টিকা পাওয়া গেলে এমন হতো না। কেন্দ্রে গিয়ে ঘুরে আসতে হয়েছে।
জেলার ১৩ উপজেলার ৫১০টি টিকাদান কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু জেলা ইপিআই স্টোরে বর্তমানে নিউমোনিয়া প্রতিরোধী পিসিভি টিকার কোনো মজুত নেই।
১১ মে কিছু টিকা এলেও ১২ মে পর্যন্ত স্টোরে বিসিজি, পেন্টাভ্যালেন্ট, ওপিভি, আইপিভি ও এমআর টিকা থাকলেও পিসিভি টিকা ছিল না।
জেলা ইপিআই স্টোরের ইনচার্জ মো. ফারুকুল ইসলাম বলেন, প্রায় এক মাস ধরে পিসিভি টিকার কোনো মজুত নেই। ঢাকাতেই এই টিকা নেই। আগে তিন মাসের টিকা একসঙ্গে পেতাম। কিন্তু ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে সমস্যা শুরু হয়। ২০২৫ সালের শুরুতে সেটা প্রকট হয়ে ওঠে।
হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, হামে আক্রান্ত হলে রোগীদের ইমিউনিটি কমে যায়। তখন নিউমোনিয়াসহ অন্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। আমরা দেখছি নিউমোনিয়ার টিকায় ড্রপআউট বেশি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের অনেক শিশু অপুষ্টিতে ভোগে। অপুষ্টির কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে, আর হাম হলে সেই জটিলতা আরও তীব্র হয়।
শিশুদের জন্য হাসপাতালে আইসিইউ না থাকায় গুরুতর রোগীদের ‘বাবল সিপ্যাপ’ পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় পাঠানো হয়।
ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফয়সাল আহমেদ বলেন, প্রথমদিকে হামের রোগী বাড়লেও এখন কিছুটা কমছে। হামের পর জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া হওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।
দেড় বছর ধরে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় এরও প্রভাব থাকতে পারে।
টিকার সরবরাহ অনিয়মিত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, টিকা পুরোপুরি বন্ধ ছিল না, কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। এখন পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। অতীতের পরিকল্পনার ঘাটতি ও অদূরদর্শিতার কারণেও বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :